ঢাকা ১১:১৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৩ মার্চ ২০২৪, ২০ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

গাজায় সহিংসতা ও যুক্তরাষ্ট্রের একপাক্ষিক নীতি

হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধ

মো. তারেক হোসেন

 

চলমান ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। অবশ্য এ সংঘাত নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এ সংকটের সমাধান এখনো অনিশ্চিত। গত ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের এক আকস্মিক হামলাকে কেন্দ্র করে পুনরায় সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে। তারই প্রতিক্রিয়ায় নিজেদের প্রতিরক্ষার দোহাই দিয়ে ইসরায়েল মিসাইল ও বিমান হামলার মাধ্যমে গাজায় নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে। যেখানে এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়েছে।

 

হামাসকে নির্মূল করার নামে ইসরায়েল সাধারণ নারী-শিশু, সাংবাদিক হত্যাসহ হাসপাতালে হামলা করতেও দ্বিধাবোধ করছে না। এছাড়া গাজা অবরোধ করে পানি, খাদ্য, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও ইন্টারনেটের মতো প্রয়োজনীয় সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে, যা একই সাথে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের এমন ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের পরও আমেরিকা প্রত্যক্ষভাবে ইসরাইলকে সমর্থন ও অস্ত্র সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।

 

এখানেই শেষ নয় গত বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন নিজে ইসরায়েল সফরের মাধ্যমে দেশটির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ সমর্থন এবং প্রয়োজনীয় সকল সহায়তার কথা জানিয়ে সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু’র সাথে। একই দিনে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ব্রাজিলের ‘মানবিক দৃষ্টিকোণ বিবেচনায় যুদ্ধবিরতি’র প্রস্তাবে ১৫ সদস্যের মধ্যে বিপক্ষে ভোট দানকারী একমাত্র দেশ ছিল যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে গত সোমবার রাশিয়ার যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবেও ভেটো দেয় আমেরিকা।

 

আদতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধান চায় না। বিখ্যাত আমেরিকান তাত্ত্বিক ও দার্শনিক নোয়াম চমস্কির ভাষায়, ‘আমেরিকার গণতন্ত্র সেই পর্যন্ত যে পর্যন্ত তার কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত।’ বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র আর মানবতার বুলি উড়ানো আমেরিকার ডাবল স্ট্যান্ডার্ড এখানে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট।

 

আমেরিকার দ্ব্যর্থহীন এই ইসরায়েল প্রীতির বেশ কয়েকটা কারণও আছে। প্রথমত, ঐতিহাসিক কারণে আমেরিকা ইসরায়েলকে সর্বদা সমর্থন দিয়ে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী শুরু হওয়া স্নায়ুযুদ্ধের প্রথম দিকে ১৯৪৮ সালে ইসরায়েলের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। স্বাধীনতা ঘোষণার ১১ মিনিটের মাথায় ইসরায়েলকে সর্বপ্রথম স্বীকৃতি দেওয়া দেশটি ছিল যুক্তরাষ্ট্র। সোভিয়েত ইউনিয়নকে প্রতিরোধে আমেরিকা নিজের প্রভাব বলয় বিস্তারের সেই সুযোগ লুফে নেয়। সেই থেকে শুরু করে ওবামা, ট্রাম্প কিংবা জো বাইডেন প্রশাসন তা বজায় রেখেছে।

 

দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার বিশ্বস্ত বন্ধু ইসরায়েল। তেল-গ্যাস সমৃদ্ধ এই বিশাল অঞ্চলে আমেরিকার সুদৃঢ় অবস্থান নিশ্চিত করতে ইসরায়েলের সাথে অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব রক্ষা করে চলে আমেরিকা। এছাড়া এ অঞ্চলে ইরানের বিস্তার ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম হাতিয়ার ইসরায়েল।

 

তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক কারণে দুই দেশের মধ্যে গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। আমেরিকার জন্য ইসরায়েল একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিবাজার। উভয় দেশ বিশাল অঙ্কের বাণিজ্যিক সম্পর্কের পাশাপাশি পারস্পরিক বিনিয়োগের সম্পর্কে জড়িত।

 

চতুর্থ কারণটি হচ্ছে পাবলিক অপিনিয়ন। মার্কিনিদের অধিকাংশই ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়ে থাকে। সুতরাং মার্কিন রাজনীতিতে যে দলই ক্ষমতায় আসুক কেউই ইসরায়েল সমর্থনের চিরায়ত সেই নীতির বিরুদ্ধে গিয়ে জনপ্রিয়তা হারানোর সাহস করে না।

 

এছাড়া আমেরিকার সমর্থন আদায়ে ইসরায়েল প্রচুর অর্থ ব্যয় করে। এই প্রচেষ্টায় ভূমিকা রাখে আইপ্যাকের মতো সংগঠন ও অন্যান্য এজেন্টগুলো। এত সব চেষ্টা-তদবিরের পেছনে একটাই কারণ আর তার হলো আমেরিকার মতো পরাশক্তিকে মিত্র হিসেবে পাশে রাখা।

 

 

(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ এর অধ্যাপক মো. তারেক হোসেন এর এই কলামটি গত ২৫ অক্টোবর ২০২৩  এ ঢাকা পোস্ট অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত। এখনি সময় পাঠকদের জন্য কিঞ্চিৎ সংক্ষেপিত আকারে প্রকাশ করা হলো।)

মন্তব্য লিখুন

গাজায় সহিংসতা ও যুক্তরাষ্ট্রের একপাক্ষিক নীতি

আপডেটের সময় ১২:১৬:৫৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৩

মো. তারেক হোসেন

 

চলমান ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। অবশ্য এ সংঘাত নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এ সংকটের সমাধান এখনো অনিশ্চিত। গত ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের এক আকস্মিক হামলাকে কেন্দ্র করে পুনরায় সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে। তারই প্রতিক্রিয়ায় নিজেদের প্রতিরক্ষার দোহাই দিয়ে ইসরায়েল মিসাইল ও বিমান হামলার মাধ্যমে গাজায় নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে। যেখানে এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়েছে।

 

হামাসকে নির্মূল করার নামে ইসরায়েল সাধারণ নারী-শিশু, সাংবাদিক হত্যাসহ হাসপাতালে হামলা করতেও দ্বিধাবোধ করছে না। এছাড়া গাজা অবরোধ করে পানি, খাদ্য, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও ইন্টারনেটের মতো প্রয়োজনীয় সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে, যা একই সাথে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের এমন ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের পরও আমেরিকা প্রত্যক্ষভাবে ইসরাইলকে সমর্থন ও অস্ত্র সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।

 

এখানেই শেষ নয় গত বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন নিজে ইসরায়েল সফরের মাধ্যমে দেশটির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ সমর্থন এবং প্রয়োজনীয় সকল সহায়তার কথা জানিয়ে সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু’র সাথে। একই দিনে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ব্রাজিলের ‘মানবিক দৃষ্টিকোণ বিবেচনায় যুদ্ধবিরতি’র প্রস্তাবে ১৫ সদস্যের মধ্যে বিপক্ষে ভোট দানকারী একমাত্র দেশ ছিল যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে গত সোমবার রাশিয়ার যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবেও ভেটো দেয় আমেরিকা।

 

আদতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধান চায় না। বিখ্যাত আমেরিকান তাত্ত্বিক ও দার্শনিক নোয়াম চমস্কির ভাষায়, ‘আমেরিকার গণতন্ত্র সেই পর্যন্ত যে পর্যন্ত তার কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত।’ বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র আর মানবতার বুলি উড়ানো আমেরিকার ডাবল স্ট্যান্ডার্ড এখানে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট।

 

আমেরিকার দ্ব্যর্থহীন এই ইসরায়েল প্রীতির বেশ কয়েকটা কারণও আছে। প্রথমত, ঐতিহাসিক কারণে আমেরিকা ইসরায়েলকে সর্বদা সমর্থন দিয়ে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী শুরু হওয়া স্নায়ুযুদ্ধের প্রথম দিকে ১৯৪৮ সালে ইসরায়েলের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। স্বাধীনতা ঘোষণার ১১ মিনিটের মাথায় ইসরায়েলকে সর্বপ্রথম স্বীকৃতি দেওয়া দেশটি ছিল যুক্তরাষ্ট্র। সোভিয়েত ইউনিয়নকে প্রতিরোধে আমেরিকা নিজের প্রভাব বলয় বিস্তারের সেই সুযোগ লুফে নেয়। সেই থেকে শুরু করে ওবামা, ট্রাম্প কিংবা জো বাইডেন প্রশাসন তা বজায় রেখেছে।

 

দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার বিশ্বস্ত বন্ধু ইসরায়েল। তেল-গ্যাস সমৃদ্ধ এই বিশাল অঞ্চলে আমেরিকার সুদৃঢ় অবস্থান নিশ্চিত করতে ইসরায়েলের সাথে অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব রক্ষা করে চলে আমেরিকা। এছাড়া এ অঞ্চলে ইরানের বিস্তার ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম হাতিয়ার ইসরায়েল।

 

তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক কারণে দুই দেশের মধ্যে গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। আমেরিকার জন্য ইসরায়েল একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিবাজার। উভয় দেশ বিশাল অঙ্কের বাণিজ্যিক সম্পর্কের পাশাপাশি পারস্পরিক বিনিয়োগের সম্পর্কে জড়িত।

 

চতুর্থ কারণটি হচ্ছে পাবলিক অপিনিয়ন। মার্কিনিদের অধিকাংশই ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়ে থাকে। সুতরাং মার্কিন রাজনীতিতে যে দলই ক্ষমতায় আসুক কেউই ইসরায়েল সমর্থনের চিরায়ত সেই নীতির বিরুদ্ধে গিয়ে জনপ্রিয়তা হারানোর সাহস করে না।

 

এছাড়া আমেরিকার সমর্থন আদায়ে ইসরায়েল প্রচুর অর্থ ব্যয় করে। এই প্রচেষ্টায় ভূমিকা রাখে আইপ্যাকের মতো সংগঠন ও অন্যান্য এজেন্টগুলো। এত সব চেষ্টা-তদবিরের পেছনে একটাই কারণ আর তার হলো আমেরিকার মতো পরাশক্তিকে মিত্র হিসেবে পাশে রাখা।

 

 

(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ এর অধ্যাপক মো. তারেক হোসেন এর এই কলামটি গত ২৫ অক্টোবর ২০২৩  এ ঢাকা পোস্ট অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত। এখনি সময় পাঠকদের জন্য কিঞ্চিৎ সংক্ষেপিত আকারে প্রকাশ করা হলো।)