ঢাকা ০৬:০৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৩ মার্চ ২০২৪, ২০ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

চোর না শোনে ধর্মের কাহিনি

চোর না শোনে ধর্মের কাহিনি

এম এ মান্নান

 

আওয়ামী লীগ সরকার এবার নির্বাচনের আগে যে ইশতেহার ঘোষণা করেছিল তার মধ্যে অন্যতম অঙ্গীকার ছিল দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণ। এর আগের বারের নির্বাচনেও একই অঙ্গীকার ছিল। আওয়ামী লীগ সরকার বিগত দিনের দেশ পরিচালনায় নানা বিষয়ে সফল হলেও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে যে বিফল হয়েছে এবারের ইশতেহার ঘোষণার পর প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং সে কথা স্বীকারও করেছেন। এবারও তিনি তার ইশতেহারে ঘোষণা করেছিলেন তার দল ক্ষমতায় গেলে তিনি বাজার নিয়ন্ত্রণে সর্বাধিক গুরুত্ব দেবেন।

বর্তমান সরকার যে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সর্বাধিক গুরুত্ব দেবে ইতোমধ্যে এ কথার জানান দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। গত ২২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন এই বলে যে, বাজার কারসাজিকারীরা যদি বাজার স্বাভাবিক না রাখে তাহলে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে তাদের ধরে ধরে জেলে ভরা হবে। বোঝাই যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী কতটা দৃঢ়চেতা এবং কতটা সংক্ষুব্ধ। বাজার নিয়ে যে একটি দুষ্টচক্র বা সিন্ডিকেট খেলা করছে সে কথা তিনি ভালো করেই জানেন। তিনি চাচ্ছেন বাজার স্বাভাবিক হোক। তাই ব্যবসায়ীদের প্রতি তার এই খেদোক্তি-হুঁশিয়ারি।

কথায় আছে- ‘চোর না শোনে ধর্মের কাহিনি’। তাই প্রধানমন্ত্রীর এসব হুংকার সিন্ডিকেট বা দুষ্টচক্রের ব্যবসায়ীদের কাছে নস্যি। তাই এ বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে হলে চোরকে ধর্মের কাহিনি না শুনিয়ে বরং ধরে ধরে জেলে ঢোকালেই মুশকিল আসান হবে। জনগণ শান্তি পাবে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখলাম বর্তমান খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মুজুমদারকে নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। তিনি শুধু বর্তমান খাদ্যমন্ত্রীই নন, অতীতেও খাদ্যমন্ত্রী ছিলেন। এবং অতীতেও তিনি আলোচিত-সমালোচিত ছিলেন। বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়ায় আরও একজন সমালোচিত ছিলেন। তিনি সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। এবার তিনি তার স্বপদে নেই।

এর আগের কোনো এক লেখায় বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেট বা কালোবাজারিদের নাম দিয়েছিলাম বদ জিনের আছর বলে। বদ জিন যাদের ওপর আছর করে তারা নাকি ভালো থাকতে পারে না। যেমন এখন ভালো নেই বাজারের নিত্যপণ্যের ক্রেতারা। মাছ, মাংস, ডিম, আলু, পেঁয়াজ, তরকারি গরম মসলা থেকে শুরু করে এমন কোনো খাদ্যপণ্য বা ভোগ্য পণ্য নেই যেখানে বদ জিনের আছর পড়েনি।

আগের দিনে শুনেছি বিলে মাছ ধরতে গেলে ধরে মেছো ভুতে। বাজার থেকে মাছ কিনে গাছের নিচ দিয়ে হেঁটে গেলে ধরে গেছো ভুতে। কিন্তু এখন মাংসের মধ্যে আবার নতুন করে ভুতে ধরেছে, এই ভুতকে কী ভুত বলা যায়? এরা হলো মাংসো ভুত।

নির্বাচনের ঠিক এক মাস আগে এই মাংস ভুতেরা ভোক্তা অধিকারের সঙ্গে সমন্বয় করে গরুর মাংসের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিল ৬৫০ টাকা কেজি। তখন এই দাম কমার স্বপক্ষে কিছু আঁতেলকে নানা মন্তব্য করতেও দেখা গেছে। অনেক আঁতেল চুলচেরা বিশ্লেষণ করে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদনও লিখেছেন। কেউ যুক্তি দেখিয়েছেন দেশে গরু উৎপাদন বেড়েছে তাই মাংসের দাম কমেছে। আবার কেউ বলেছেন দেশে গরুর ঘাটতি নেই, পাশাপাশি গো-খাদ্যের উৎপাদন বেড়েছে তাই গরুর মাংশের দাম কমেছে। আমরা তাদের কারও কথায় দ্বিমত পোষণ করছি না। দ্বিমত পোষণ করছি অন্য জায়গায়। নির্বাচনের আগে কেন গরুর মাংসের দাম কমে গিয়ে আবার বেড়ে গেল। যেসব আঁতেল গরুর উৎপাদন বেড়েছে এবং গো-খাদ্যের সংকট নেই বলে নানা যুক্তি দাঁড় করিয়েছিলেন, তারা এখন গরুর মাংসের দাম বাড়ায় কী যুক্তি দাঁড় করাবেন। দেশে তো এক মাসের মধ্যে এমন কোনো রোজকিয়ামত সংঘটিত হয়নি যে রাতারাতি গো-খাদ্য এবং গরুর সংকট দেখা দেবে, আর তাই গরুর মাংস দুর্মূল্যে পরিণত হবে। তাহলে কি আমরা ধরে নেব, নির্বাচনের আগে যারা গুরুর মাংসের দাম কমানো নিয়ে নানা কথা বলেছেন তা তাদের মন গড়া খোঁড়া যুক্তি ছাড়া কিছুই না, বা চাটুকারিতা।

কোনো কিছুকে বশে আনতে হলে নাকি বশীকরণ করতে হয়। তাই বশীকরণের জন্য গো-মাংস ভোগীদের জন্য এক মাসের দাওয়াই দিয়েছিল গরুর খামারি ও মাংস ব্যবসায়ীরা। যাতে পরে দাম বেড়ে গেলে কোনো উচ্চবাচ্য করতে না পারে। চোখ বন্ধ করে শুধু কিনবে আর খাবে।

অস্বীকার করব না, নির্বাচনের এক মাস আগে গরুর মাংসের দাম ৬৫০ টাকা কেজি নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও সাধারণ ক্রেতারা এর থেকে আরও কম দামে গরুর মাংস কিনেছেন। তখন অনেক জায়গায় ৬৫০ টাকা নির্ধারিত দামের কমে ৬০০ টাকা কেজি দরে এবং কোথাও কোথাও আরও কম দামে গরুর মাংস বিক্রি করতে দেখা গেছে। দেখা গেছে মাইকিং করে গরুর মাংস বিক্রি করতেও। আর ক্রেতাদের দেখা গেছে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে গরুর মাংস ক্রয় করতে। এখানেই বশীকরণে সিন্ডিকেট সফল। এখন বাজারে তার উল্টো চিত্র। এ যেন শুভংকরের ফাঁকি। মিথ্যে মরীচিকা। তাই গরুর মাংস আবার দুর্মূল্যে পরিণত হয়েছে। যা নিম্ন আয়ের মানুষ দেখে স্বাদ মেটাবে, ক্রয় করে নয়।

দৈনিক বাংলায় গরুর মাংসের দাম বাড়া নিয়ে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয় অতি সম্প্রতি। ওই সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে, এখন থেকে নির্ধারিত দামে গরুর মাংস বিক্রি করবেন না ব্যবসায়ীরা। গরুর মাংসের দাম কী হবে তা নিয়েও ব্যসায়ীরা একটি সভা করেছেন। উভয় সভার সিদ্ধান্ত নির্ধারিত দামে গরুর মাংস বিক্রি না করা। কারণ হিসেবে তারা যুক্তি দেখিয়েছেন, নির্ধারিত দামে গরুর মাংস বিক্রি করতে গিয়ে তাদের লোকসানের শিকার হতে হচ্ছে। তাই তারা আর লোকসান গুনতে চান না। লোকসান দিয়ে কেউ ব্যবসা করবেন না, এটা আরও সত্যি কথা। তাই তাদের কথায়ও দ্বিমত পোষণ করছি না। কিন্তু যে কথা সত্যি তা হলো, নির্বাচনের এক মাস আগে যখন গরুর মাংসের দাম ৬৫০ টাকা কেজি দাম নির্ধারণ করা হয়, তখন তো এই খামারি এবং ব্যবসায়ীরাই সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তাহলে তারা কেন তখন গরুর মাংসের দাম কমালেন। আর এখন কেন বলছেন, নির্ধারিত দামে গরুর মাংস বিক্রি করলে ব্যবসায় লোকসান হয়। নুরানি চেহারার এক প্রবীণ মাংস বিক্রেতাকে দেখলাম টেলিভিশন চ্যানেলে মাংসের দাম বাড়া নিয়ে সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলতে। তিনি তোতা পাখির মতো বলে যাচ্ছেন আমরা পাবনা, কুষ্টিয়া, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী থেকে গরু কিনে ঢাকায় মাংস বিক্রি করি। ওই সব এলাকায় এখনো গরুর মাংস ৭০০ টাকা কেজি। তাহলে আমরা ঢাকার বাইরে থেকে গরু কিনে এনে কীভাবে ঢাকায় ৬৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি করব। আমার প্রশ্ন, ওই প্রবীণও তো মাংসের দাম বাড়া নিয়ে আগে কোনো কথা বলেননি। এখন যা বলছেন। তাহলে কি আমরা ধরে নিতে পারি না, গরুর মাংসের দাম বাড়া-কমা নিয়ে যা হচ্ছে তার সবই খামারি এবং ব্যবসায়ীদের যোগসাজশে। এখানেই মাংসো ভুতের আছর। এবং তারা সফল।

একশ্রেণির লোক আছেন যারা ভারতীয় পণ্য বর্জনে একাট্টা। তারা অতিশয় দেশদরদি। আমিও দেশদরদির। কিন্তু কয়েক দিন আগে যখন ভারত বাংলাদেশে সাময়িকভাবে পেঁয়াজ বন্ধের ঘোষণা দিল ঠিক কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পেঁয়াজের দাম কেজিতে বেড়ে গেল ৪০-৫০ টাকা। তখন কিন্তু দেশদরদি লোকেরা কোনো উচ্চবাচ্য করলেন না। চোখ বন্ধ করে বেশি দামে পেঁয়াজ কিনতে শুরু করলেন। এখনো আমরা পেঁয়াজ খাচ্ছি ৮০ টাকা কেজি দরে।

সামনে পবিত্র শবেবরাত ও রমজান। দুনিয়ার দেশে দেশে পবিত্র রমজানকে কেন্দ্র করে সব কিছুর দাম কমে। আর আমাদের অতি ধার্মিক দেশে সব জিনিসের দাম বাড়ানো ব্যবসায়ীদের চিরাচরিত বদ-অভ্যাসে পরিণত হয়। এবারও এর ব্যতিক্রম হবে বলে মনে হচ্ছে না। বরং আগেভাগেই তার পূর্বলক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাই গরুর মাংস নির্বাচনের আগে যে দামে বিক্রি হতো এখন তার থেকে আরও বেশি দাম বিক্রি হচ্ছে। রমজানে হয়তো বাড়বে আরও এক ধাপ। সিন্ডিকেটের সাফল্য এখানেই। এ কথা ঠিক যে অসৎ ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ভাঙার জন্য সরকার বদ্ধকর। ওবায়দুল কাদের গত শনিবার এক ভাষণে বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর ওপর আস্থা রাখতে। আমরা আশা রাখলাম। কিন্তু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট এত মজবুত যে তা ভাঙা সরকারের পক্ষে অনেক কঠিন। তবে সদিচ্ছা থাকলে দুঃসাধ্য নয় মোটেও।

 

(কবি ও সাংবাদিক এম এ মান্নানের এ লেখাটি আজ ৩০ জানুয়ারি দৈনিক বাংলা পত্রিকা ও দৈনিক বাংলা অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত। এখনই সময়ের পাঠকদের জন্য কিঞ্চিৎ সংক্ষেপিত আকারে প্রকাশিত হলো।)

মন্তব্য লিখুন

চোর না শোনে ধর্মের কাহিনি

আপডেটের সময় ১২:৫৩:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৪

এম এ মান্নান

 

আওয়ামী লীগ সরকার এবার নির্বাচনের আগে যে ইশতেহার ঘোষণা করেছিল তার মধ্যে অন্যতম অঙ্গীকার ছিল দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণ। এর আগের বারের নির্বাচনেও একই অঙ্গীকার ছিল। আওয়ামী লীগ সরকার বিগত দিনের দেশ পরিচালনায় নানা বিষয়ে সফল হলেও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে যে বিফল হয়েছে এবারের ইশতেহার ঘোষণার পর প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং সে কথা স্বীকারও করেছেন। এবারও তিনি তার ইশতেহারে ঘোষণা করেছিলেন তার দল ক্ষমতায় গেলে তিনি বাজার নিয়ন্ত্রণে সর্বাধিক গুরুত্ব দেবেন।

বর্তমান সরকার যে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সর্বাধিক গুরুত্ব দেবে ইতোমধ্যে এ কথার জানান দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। গত ২২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন এই বলে যে, বাজার কারসাজিকারীরা যদি বাজার স্বাভাবিক না রাখে তাহলে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে তাদের ধরে ধরে জেলে ভরা হবে। বোঝাই যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী কতটা দৃঢ়চেতা এবং কতটা সংক্ষুব্ধ। বাজার নিয়ে যে একটি দুষ্টচক্র বা সিন্ডিকেট খেলা করছে সে কথা তিনি ভালো করেই জানেন। তিনি চাচ্ছেন বাজার স্বাভাবিক হোক। তাই ব্যবসায়ীদের প্রতি তার এই খেদোক্তি-হুঁশিয়ারি।

কথায় আছে- ‘চোর না শোনে ধর্মের কাহিনি’। তাই প্রধানমন্ত্রীর এসব হুংকার সিন্ডিকেট বা দুষ্টচক্রের ব্যবসায়ীদের কাছে নস্যি। তাই এ বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে হলে চোরকে ধর্মের কাহিনি না শুনিয়ে বরং ধরে ধরে জেলে ঢোকালেই মুশকিল আসান হবে। জনগণ শান্তি পাবে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখলাম বর্তমান খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মুজুমদারকে নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। তিনি শুধু বর্তমান খাদ্যমন্ত্রীই নন, অতীতেও খাদ্যমন্ত্রী ছিলেন। এবং অতীতেও তিনি আলোচিত-সমালোচিত ছিলেন। বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়ায় আরও একজন সমালোচিত ছিলেন। তিনি সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। এবার তিনি তার স্বপদে নেই।

এর আগের কোনো এক লেখায় বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেট বা কালোবাজারিদের নাম দিয়েছিলাম বদ জিনের আছর বলে। বদ জিন যাদের ওপর আছর করে তারা নাকি ভালো থাকতে পারে না। যেমন এখন ভালো নেই বাজারের নিত্যপণ্যের ক্রেতারা। মাছ, মাংস, ডিম, আলু, পেঁয়াজ, তরকারি গরম মসলা থেকে শুরু করে এমন কোনো খাদ্যপণ্য বা ভোগ্য পণ্য নেই যেখানে বদ জিনের আছর পড়েনি।

আগের দিনে শুনেছি বিলে মাছ ধরতে গেলে ধরে মেছো ভুতে। বাজার থেকে মাছ কিনে গাছের নিচ দিয়ে হেঁটে গেলে ধরে গেছো ভুতে। কিন্তু এখন মাংসের মধ্যে আবার নতুন করে ভুতে ধরেছে, এই ভুতকে কী ভুত বলা যায়? এরা হলো মাংসো ভুত।

নির্বাচনের ঠিক এক মাস আগে এই মাংস ভুতেরা ভোক্তা অধিকারের সঙ্গে সমন্বয় করে গরুর মাংসের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিল ৬৫০ টাকা কেজি। তখন এই দাম কমার স্বপক্ষে কিছু আঁতেলকে নানা মন্তব্য করতেও দেখা গেছে। অনেক আঁতেল চুলচেরা বিশ্লেষণ করে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদনও লিখেছেন। কেউ যুক্তি দেখিয়েছেন দেশে গরু উৎপাদন বেড়েছে তাই মাংসের দাম কমেছে। আবার কেউ বলেছেন দেশে গরুর ঘাটতি নেই, পাশাপাশি গো-খাদ্যের উৎপাদন বেড়েছে তাই গরুর মাংশের দাম কমেছে। আমরা তাদের কারও কথায় দ্বিমত পোষণ করছি না। দ্বিমত পোষণ করছি অন্য জায়গায়। নির্বাচনের আগে কেন গরুর মাংসের দাম কমে গিয়ে আবার বেড়ে গেল। যেসব আঁতেল গরুর উৎপাদন বেড়েছে এবং গো-খাদ্যের সংকট নেই বলে নানা যুক্তি দাঁড় করিয়েছিলেন, তারা এখন গরুর মাংসের দাম বাড়ায় কী যুক্তি দাঁড় করাবেন। দেশে তো এক মাসের মধ্যে এমন কোনো রোজকিয়ামত সংঘটিত হয়নি যে রাতারাতি গো-খাদ্য এবং গরুর সংকট দেখা দেবে, আর তাই গরুর মাংস দুর্মূল্যে পরিণত হবে। তাহলে কি আমরা ধরে নেব, নির্বাচনের আগে যারা গুরুর মাংসের দাম কমানো নিয়ে নানা কথা বলেছেন তা তাদের মন গড়া খোঁড়া যুক্তি ছাড়া কিছুই না, বা চাটুকারিতা।

কোনো কিছুকে বশে আনতে হলে নাকি বশীকরণ করতে হয়। তাই বশীকরণের জন্য গো-মাংস ভোগীদের জন্য এক মাসের দাওয়াই দিয়েছিল গরুর খামারি ও মাংস ব্যবসায়ীরা। যাতে পরে দাম বেড়ে গেলে কোনো উচ্চবাচ্য করতে না পারে। চোখ বন্ধ করে শুধু কিনবে আর খাবে।

অস্বীকার করব না, নির্বাচনের এক মাস আগে গরুর মাংসের দাম ৬৫০ টাকা কেজি নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও সাধারণ ক্রেতারা এর থেকে আরও কম দামে গরুর মাংস কিনেছেন। তখন অনেক জায়গায় ৬৫০ টাকা নির্ধারিত দামের কমে ৬০০ টাকা কেজি দরে এবং কোথাও কোথাও আরও কম দামে গরুর মাংস বিক্রি করতে দেখা গেছে। দেখা গেছে মাইকিং করে গরুর মাংস বিক্রি করতেও। আর ক্রেতাদের দেখা গেছে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে গরুর মাংস ক্রয় করতে। এখানেই বশীকরণে সিন্ডিকেট সফল। এখন বাজারে তার উল্টো চিত্র। এ যেন শুভংকরের ফাঁকি। মিথ্যে মরীচিকা। তাই গরুর মাংস আবার দুর্মূল্যে পরিণত হয়েছে। যা নিম্ন আয়ের মানুষ দেখে স্বাদ মেটাবে, ক্রয় করে নয়।

দৈনিক বাংলায় গরুর মাংসের দাম বাড়া নিয়ে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয় অতি সম্প্রতি। ওই সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে, এখন থেকে নির্ধারিত দামে গরুর মাংস বিক্রি করবেন না ব্যবসায়ীরা। গরুর মাংসের দাম কী হবে তা নিয়েও ব্যসায়ীরা একটি সভা করেছেন। উভয় সভার সিদ্ধান্ত নির্ধারিত দামে গরুর মাংস বিক্রি না করা। কারণ হিসেবে তারা যুক্তি দেখিয়েছেন, নির্ধারিত দামে গরুর মাংস বিক্রি করতে গিয়ে তাদের লোকসানের শিকার হতে হচ্ছে। তাই তারা আর লোকসান গুনতে চান না। লোকসান দিয়ে কেউ ব্যবসা করবেন না, এটা আরও সত্যি কথা। তাই তাদের কথায়ও দ্বিমত পোষণ করছি না। কিন্তু যে কথা সত্যি তা হলো, নির্বাচনের এক মাস আগে যখন গরুর মাংসের দাম ৬৫০ টাকা কেজি দাম নির্ধারণ করা হয়, তখন তো এই খামারি এবং ব্যবসায়ীরাই সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তাহলে তারা কেন তখন গরুর মাংসের দাম কমালেন। আর এখন কেন বলছেন, নির্ধারিত দামে গরুর মাংস বিক্রি করলে ব্যবসায় লোকসান হয়। নুরানি চেহারার এক প্রবীণ মাংস বিক্রেতাকে দেখলাম টেলিভিশন চ্যানেলে মাংসের দাম বাড়া নিয়ে সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলতে। তিনি তোতা পাখির মতো বলে যাচ্ছেন আমরা পাবনা, কুষ্টিয়া, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী থেকে গরু কিনে ঢাকায় মাংস বিক্রি করি। ওই সব এলাকায় এখনো গরুর মাংস ৭০০ টাকা কেজি। তাহলে আমরা ঢাকার বাইরে থেকে গরু কিনে এনে কীভাবে ঢাকায় ৬৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি করব। আমার প্রশ্ন, ওই প্রবীণও তো মাংসের দাম বাড়া নিয়ে আগে কোনো কথা বলেননি। এখন যা বলছেন। তাহলে কি আমরা ধরে নিতে পারি না, গরুর মাংসের দাম বাড়া-কমা নিয়ে যা হচ্ছে তার সবই খামারি এবং ব্যবসায়ীদের যোগসাজশে। এখানেই মাংসো ভুতের আছর। এবং তারা সফল।

একশ্রেণির লোক আছেন যারা ভারতীয় পণ্য বর্জনে একাট্টা। তারা অতিশয় দেশদরদি। আমিও দেশদরদির। কিন্তু কয়েক দিন আগে যখন ভারত বাংলাদেশে সাময়িকভাবে পেঁয়াজ বন্ধের ঘোষণা দিল ঠিক কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পেঁয়াজের দাম কেজিতে বেড়ে গেল ৪০-৫০ টাকা। তখন কিন্তু দেশদরদি লোকেরা কোনো উচ্চবাচ্য করলেন না। চোখ বন্ধ করে বেশি দামে পেঁয়াজ কিনতে শুরু করলেন। এখনো আমরা পেঁয়াজ খাচ্ছি ৮০ টাকা কেজি দরে।

সামনে পবিত্র শবেবরাত ও রমজান। দুনিয়ার দেশে দেশে পবিত্র রমজানকে কেন্দ্র করে সব কিছুর দাম কমে। আর আমাদের অতি ধার্মিক দেশে সব জিনিসের দাম বাড়ানো ব্যবসায়ীদের চিরাচরিত বদ-অভ্যাসে পরিণত হয়। এবারও এর ব্যতিক্রম হবে বলে মনে হচ্ছে না। বরং আগেভাগেই তার পূর্বলক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাই গরুর মাংস নির্বাচনের আগে যে দামে বিক্রি হতো এখন তার থেকে আরও বেশি দাম বিক্রি হচ্ছে। রমজানে হয়তো বাড়বে আরও এক ধাপ। সিন্ডিকেটের সাফল্য এখানেই। এ কথা ঠিক যে অসৎ ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ভাঙার জন্য সরকার বদ্ধকর। ওবায়দুল কাদের গত শনিবার এক ভাষণে বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর ওপর আস্থা রাখতে। আমরা আশা রাখলাম। কিন্তু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট এত মজবুত যে তা ভাঙা সরকারের পক্ষে অনেক কঠিন। তবে সদিচ্ছা থাকলে দুঃসাধ্য নয় মোটেও।

 

(কবি ও সাংবাদিক এম এ মান্নানের এ লেখাটি আজ ৩০ জানুয়ারি দৈনিক বাংলা পত্রিকা ও দৈনিক বাংলা অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত। এখনই সময়ের পাঠকদের জন্য কিঞ্চিৎ সংক্ষেপিত আকারে প্রকাশিত হলো।)