ঢাকা ০৬:২৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৩ মার্চ ২০২৪, ২০ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ : ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে যেন ওঠে

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ : ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে যেন ওঠে

ড. মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

 

আজ ৩০ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন গত ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিএনপিসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দল এ নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহত করার কথা ঘোষণা করে নির্বাচনের প্রাক্কালে দেশে নৈরাজ্য এবং অস্থিরতা তৈরি করেছিল। নির্বাচন বর্জন করার তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল, নির্বাচনটিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন এবং বিতর্কিত করা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে ধরনের নির্বাচন যাতে অনুষ্ঠিত না হয় সেজন্য নিজ দলের মনোনীত প্রার্থীর পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেন। এটি অভিনব চিন্তা হিসেবে সবার প্রশংসা কুড়িয়েছে। নির্বাচনে জাতীয় পার্টিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেছিল। নির্বাচনে মোট ৩৮২ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। এর মধ্যে বেশির ভাগই আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন। এর ফলে নির্বাচনটি বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। নির্বাচন বর্জনকারীদের উদ্দেশ্য সফল হয়নি। ১৫০টির অধিক আসনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল। ৫৯ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হয়ে আসেন। মোট ৬২ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী এ নির্বাচনে জয়লাভ করেন। অতীতের কোনো সংসদ নির্বাচনে এত সংখ্যক স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচিত হননি। তা ছাড়া আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীদের হারিয়ে অনেকে নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের বেশি সংখ্যকই আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন। নির্বাচনে দলের মনোনীত এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেমন হয়েছে, অনেক জায়গায় রেষারেষিও হয়েছে। সাধারণত দলীয় মনোনীত প্রার্থীর বিপরীতে দলের কেউ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন না। কিন্তু যেহেতু বিএনপি এবং আন্দোলনকারী দলগুলো নির্বাচনটিকে বিতর্কিত করতে চেয়েছিল, তাই দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করার জন্যই দলের গঠনতন্ত্রের নিয়ম এক্ষেত্রে স্থগিত রেখে দলীয় ব্যক্তিদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য উন্মুক্ত করে দিলেন। ফলে নির্বাচনটি যেমন অভূতপূর্ব হয়েছে, জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রেও নতুন অভিজ্ঞতার জন্ম দিয়েছে। দলের মনোনীত প্রার্থীদের বিপরীতে দলের স্বতন্ত্র যেসব প্রার্থী জয়ী হয়ে এসেছেন, তারা জনগণের ভোটারদের কাছে দলের মনোনীত প্রার্থীর চেয়ে বেশি জনপ্রিয় ছিলেন- সেটি প্রমাণিত হলো। এর মাধ্যমে দলের নির্বাচনী বোর্ড প্রতিবার দলের যাদের মনোনয়ন দিয়ে থাকে তাদের অনেকেই যে ভোটারদের কাছে ততটা জনপ্রিয় থাকেন না যতটা একই আসনে অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে কেউ কেউ থাকেন- সেটি এবার বোঝা সম্ভব হয়েছে। প্রতিবারই বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন নিয়ে অসন্তোষ, দলত্যাগ, বিদ্রোহ অথবা নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ার যেসব ঘটনা ঘটতে আমরা দেখে এসেছি। এবার মনোনয়ন উন্মুক্ত করে দেয়ার ফলে মাঠের বাস্তব চিত্রটি বড় দলের বোঝার জন্য সুযোগ করে দিয়েছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এককভাবে ২২৩টি আসন লাভ করে এবং স্বতন্ত্র সদস্য হিসেবে ৬২ জন জয়লাভ করেন। এ ছাড়া জাতীয় পার্টি ১১ জন, জাসদ একজন, ওয়ার্কার্স পার্টি একজন ও কল্যাণ পার্টির একজন জয়লাভ করেন। একটি আসনের নির্বাচন বাকি রয়েছে। মোট ২৯৮ জন এবং পরে একজনসহ মোট ২৯৯ জন শপথ নিয়ে আজকের অধিবেশনে বসতে যাচ্ছেন। নিয়মানুযায়ী স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত বা পুনর্নির্বাচিত হবেন, মহামান্য রাষ্ট্রপতি ভাষণ দেবেন। এ ছাড়া সংসদীয় পদ্ধতির নিয়ম অনুযায়ী প্রথম দিন আরো বেশ কিছু কার্যপ্রণালি বিধি পালন করা হবে।
সবার মুখে মুখে এবার দুটি প্রশ্ন বেশ ঘুরপাক খাচ্ছে। একটি হলো স্বতন্ত্র সদস্যরা কোথায় বসবেন? অপর প্রশ্নটি হলো, সংসদে বিরোধী দলের আসনে স্বতন্ত্ররা বসবেন নাকি জাতীয় পার্টির ১১ জন বসবেন? তবে এরই মধ্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে স্বতন্ত্র সদস্যরা বিরোধী দলে নয় বরং তারা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন আসনের পদধারী হওয়ার কারণে দলের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন। ফলে সংসদে এককভাবে আওয়ামী লীগের সদস্য সংখ্যা ২৮৩ জনের বেশি হতে যাচ্ছে। ১৯৭৩-এর সংসদ ছাড়া পরবর্তী আর কোনো সংসদে আওয়ামী লীগের এতজন সংসদ সদস্য ছিলেন না। সংসদে জাতীয় পার্টি বিরোধী দলের আসনে বসলেও জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরে চলছে গৃহবিবাদ। জাতীয় পার্টি বিরোধী দলের আসনে বসলেও এ দলের সদস্যরা বিরোধী দলের ভূমিকায় কতটা জনগণের দৃষ্টি কেড়ে নিতে পারবেন তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। সাধারণভাবে সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে নানা ইস্যু নিয়ে তর্ক-বিতর্ক, মতবিরোধ, এমনকি তীব্র উত্তেজনা থেকে সংসদ বর্জনের মতো ঘটনাও ঘটে থাকে। এসবই সংসদীয় পদ্ধতিতে আমাদের এখানেও ঘটেছে, অন্য দেশগুলোতেও ঘটতে দেখা যাচ্ছে। গত কয়েকটি সংসদে এ দৃশ্যের অবতারণা খুব বেশি একটা ঘটেনি, এবারো খুব বেশি ঘটবে না- এমনটি মনে করা হচ্ছে। অতীতে যেসব সংসদে বিরোধ, উত্তেজনা এবং সংসদ বর্জনের মতো ঘটনা ঘটেছিল সেগুলোর নানা কারণ ছিল। একটা বিষয় পরিষ্কার, এবারের সংসদে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ এবং অসাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্য নেই। ফলে ওইসব প্রশ্নে কোনো বিরোধ এ সংসদে দেখা যাবে না। বিরোধ এবং দ্বন্দ্ব বিভিন্ন ইস্যুতে হতেই পারে। কিন্তু সেই বিরোধ যেন হয় যুক্তিতর্কের মাধ্যমে প্রকৃত সমাধান মেনে নেয়ার সংস্কৃতিতে।

বাংলাদেশের রাজনীতির বাস্তবতা সম্পর্কে আমরা কমবেশি অবহিত। বড় দুই দল বা জোটের মধ্যে আদর্শের বিরোধ সবচেয়ে বড়। সেই বিরোধের মীমাংসা সহজে হওয়ার নয়। কারণ স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড, ৭ নভেম্বরের ক্ষমতা দখল, ২০০৪-এর ২১ আগস্ট এবং ২০০৫-এর ১৭ আগস্টের ঘটনাবলি আমাদের রাজনীতিকে দুই মেরুতে বিভক্ত করে রেখেছে। কিছু বিদেশি শক্তি এবং দেশের নাগরিক সমাজসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের একটি অংশ বিএনপি ও জামায়াতসহ দক্ষিণ মেরুর শক্তিকে দেশের রাজনীতি, সংসদ এবং সরকারে দেখতে চায় এবং সেই চাওয়ার মধ্যেই তাদের দৃষ্টিতে বহুমত এবং ‘গণতন্ত্রের বিউটি’ রয়েছে বলে মনে করে থাকে। কিন্তু দক্ষিণ মেরুর রাজনীতি প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সরকার কিংবা বিরোধী রাজনীতির মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রকে কতটা এগিয়ে নিতে পারে সেটি মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ’৭৫-এর পর থেকে আমরা সরকারবিরোধী দল কিংবা জাতীয় সংসদে সরকার ও বিরোধী দলে অবস্থান করতে দেখলেও গণতান্ত্রিক রাজনীতি তাতে খুব বেশি অগ্রসর হয়েছে এমনটি দাবি করা যাবে না। সংসদে এবং ময়দানে দুই মেরুর দুই দলের অবস্থান কতটা বিরোধ, দ্ব›দ্ব-সংঘাত এবং আওয়ামী লীগ নিঃশেষিত করে দেয়ার সাক্ষ্য বহন করে- সেটি আঙুল দিয়ে দেখানোর প্রয়োজন পড়ে না। তবে গণতন্ত্রে সরকার এবং বিরোধী দলের আবশ্যকতা অনস্বীকার্য। কিন্তু সেই দুই শক্তিকে হতে হয় অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক, দেশ, মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িকতা এবং পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গির অবস্থান কোনো অবস্থাতেই যেন পরস্পরবিরোধী দুই মেরুতে না থাকে। দুঃখজনক হলেও সত্য, তেমন রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশে তৈরি হয়নি। এখানে পরস্পর আদর্শবিরোধী হওয়ার কারণে নির্বাচন পণ্ড করার চেষ্টা হয়। জোরজবরদস্তি, অগ্নিসংযোগ, মানুষ হত্যা ইত্যাদি ঘটানোর চেষ্টা করা হয়। এটি অনেকটাই বাহুবল প্রদর্শনী ছাড়া অন্য কিছু নয়। গণতন্ত্র হচ্ছে যুক্তির মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রকে আইন, নিয়মকানুন, শৃঙ্খলা এবং উন্নতি, অগ্রগতির দিকে এগিয়ে নেয়ার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা। কিন্তু সেই রাজনৈতিক শক্তির অভাব ৫০ বছরেও ঘুচেনি। বরং সেটি আরো তীব্রতর হয়ে উঠেছে। সে কারণেই নির্বাচন পণ্ড করার চেষ্টা বারবার ঘটেছে। ফলে সংসদে গণতন্ত্রের সংস্কৃতি ধারণকারী রাজনৈতিক শক্তির সমাবেশ ঘটার ক্ষেত্রে নানা ব্যত্যয় ঘটছে।

নতুন দ্বাদশ জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগকে সেই ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে যেখানে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি কোনোভাবেই লঙ্ঘিত হবে না। কোনো আইন আলোচনা-পর্যালোচনা ছাড়া গ্রহণ করা হবে না। সংসদকে কার্যকর করে রাখার মতো উদারতা আওয়ামী লীগকেই দেখাতে হবে। বিরোধী দল যেসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে সেই প্রশ্ন যদি যুক্তিসঙ্গত হয় তাহলে কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। সংসদ যেন কোনো অবস্থাতেই প্রাণহীন, আলোচনাহীন কিংবা যুক্তিতর্কের বাইরে গিয়ে কোনো কার্যক্রম হাতে না নেয়। সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা যেন মুক্তমনে জনগণের কল্যাণে উত্থাপিত যে কোনো বিল, আইন আলোচনা-পর্যালোচনা এবং তর্কবিতর্কের মাধ্যমে গ্রহণ করার সংস্কৃতি চালু করে। সংসদের কার্যাবলি যারা দেখবেন তারা বলতে পারেন যে, এই সংসদ প্রায় এক আদর্শের সদস্যদের নিয়ে হলেও শেষ বিচারে সংসদটি জনগণের কল্যাণে অবদান রাখতে পেরেছে। সেভাবেই কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এ সংসদকে নিয়ে ভেতরে বা বাইরে কেউ যেন ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ না করতে পারে সে ব্যাপারেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সরকারি দলের বলেই যেন কেউ দায়িত্বে অবহেলা না করে সে বিষয়টিও মনে রাখা দরকার। ৫ বছর শেষে দেশের মানুষ যেন বলতে পারে যে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ জনগণের হয়েই কাজ করেছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করেনি। কোনো মন্ত্রী, এমপিকে নিয়ে যেন সংসদের বাইরে মুখরোচক কথা না শোনা যায়। যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হয়ে এসেছেন তারা যেন তা ভুলে না যান। ৫ বছর পর মানুষ যদি মনে করে যে এ সংসদে বড় কোনো বিরোধী দল না থাকার পরও সরকারি দল কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি করেনি, গণতন্ত্র পরিপন্থি কোনো কাজ করেনি। সংসদের আলোচনা-সমালোচনাগুলো যেন মানুষের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে উন্নত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ যেন হয়ে ওঠে গণতন্ত্রের সবচেয়ে উল্লেখ করার মতো পাঠশালা- যেটি গঠনে ব্যতিক্রম, আইন এবং সংসদীয় রীতিনীতির চর্চায়ও নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করে অমর হয়ে থাকে।

 

(অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারীর এ লেখাটি গত ৩০ জানুয়ারি ভোরের কাগজ পত্রিকা ও ভোরের কাগজ অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত। এখনই সময়ের পাঠকদের জন্য কিঞ্চিৎ সংক্ষেপিত আকারে প্রকাশিত হলো।)

মন্তব্য লিখুন

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ : ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে যেন ওঠে

আপডেটের সময় ০১:৫১:৩৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৪

ড. মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

 

আজ ৩০ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন গত ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিএনপিসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দল এ নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহত করার কথা ঘোষণা করে নির্বাচনের প্রাক্কালে দেশে নৈরাজ্য এবং অস্থিরতা তৈরি করেছিল। নির্বাচন বর্জন করার তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল, নির্বাচনটিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন এবং বিতর্কিত করা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে ধরনের নির্বাচন যাতে অনুষ্ঠিত না হয় সেজন্য নিজ দলের মনোনীত প্রার্থীর পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেন। এটি অভিনব চিন্তা হিসেবে সবার প্রশংসা কুড়িয়েছে। নির্বাচনে জাতীয় পার্টিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেছিল। নির্বাচনে মোট ৩৮২ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। এর মধ্যে বেশির ভাগই আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন। এর ফলে নির্বাচনটি বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। নির্বাচন বর্জনকারীদের উদ্দেশ্য সফল হয়নি। ১৫০টির অধিক আসনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল। ৫৯ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হয়ে আসেন। মোট ৬২ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী এ নির্বাচনে জয়লাভ করেন। অতীতের কোনো সংসদ নির্বাচনে এত সংখ্যক স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচিত হননি। তা ছাড়া আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীদের হারিয়ে অনেকে নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের বেশি সংখ্যকই আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন। নির্বাচনে দলের মনোনীত এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেমন হয়েছে, অনেক জায়গায় রেষারেষিও হয়েছে। সাধারণত দলীয় মনোনীত প্রার্থীর বিপরীতে দলের কেউ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন না। কিন্তু যেহেতু বিএনপি এবং আন্দোলনকারী দলগুলো নির্বাচনটিকে বিতর্কিত করতে চেয়েছিল, তাই দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করার জন্যই দলের গঠনতন্ত্রের নিয়ম এক্ষেত্রে স্থগিত রেখে দলীয় ব্যক্তিদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য উন্মুক্ত করে দিলেন। ফলে নির্বাচনটি যেমন অভূতপূর্ব হয়েছে, জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রেও নতুন অভিজ্ঞতার জন্ম দিয়েছে। দলের মনোনীত প্রার্থীদের বিপরীতে দলের স্বতন্ত্র যেসব প্রার্থী জয়ী হয়ে এসেছেন, তারা জনগণের ভোটারদের কাছে দলের মনোনীত প্রার্থীর চেয়ে বেশি জনপ্রিয় ছিলেন- সেটি প্রমাণিত হলো। এর মাধ্যমে দলের নির্বাচনী বোর্ড প্রতিবার দলের যাদের মনোনয়ন দিয়ে থাকে তাদের অনেকেই যে ভোটারদের কাছে ততটা জনপ্রিয় থাকেন না যতটা একই আসনে অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে কেউ কেউ থাকেন- সেটি এবার বোঝা সম্ভব হয়েছে। প্রতিবারই বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন নিয়ে অসন্তোষ, দলত্যাগ, বিদ্রোহ অথবা নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ার যেসব ঘটনা ঘটতে আমরা দেখে এসেছি। এবার মনোনয়ন উন্মুক্ত করে দেয়ার ফলে মাঠের বাস্তব চিত্রটি বড় দলের বোঝার জন্য সুযোগ করে দিয়েছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এককভাবে ২২৩টি আসন লাভ করে এবং স্বতন্ত্র সদস্য হিসেবে ৬২ জন জয়লাভ করেন। এ ছাড়া জাতীয় পার্টি ১১ জন, জাসদ একজন, ওয়ার্কার্স পার্টি একজন ও কল্যাণ পার্টির একজন জয়লাভ করেন। একটি আসনের নির্বাচন বাকি রয়েছে। মোট ২৯৮ জন এবং পরে একজনসহ মোট ২৯৯ জন শপথ নিয়ে আজকের অধিবেশনে বসতে যাচ্ছেন। নিয়মানুযায়ী স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত বা পুনর্নির্বাচিত হবেন, মহামান্য রাষ্ট্রপতি ভাষণ দেবেন। এ ছাড়া সংসদীয় পদ্ধতির নিয়ম অনুযায়ী প্রথম দিন আরো বেশ কিছু কার্যপ্রণালি বিধি পালন করা হবে।
সবার মুখে মুখে এবার দুটি প্রশ্ন বেশ ঘুরপাক খাচ্ছে। একটি হলো স্বতন্ত্র সদস্যরা কোথায় বসবেন? অপর প্রশ্নটি হলো, সংসদে বিরোধী দলের আসনে স্বতন্ত্ররা বসবেন নাকি জাতীয় পার্টির ১১ জন বসবেন? তবে এরই মধ্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে স্বতন্ত্র সদস্যরা বিরোধী দলে নয় বরং তারা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন আসনের পদধারী হওয়ার কারণে দলের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন। ফলে সংসদে এককভাবে আওয়ামী লীগের সদস্য সংখ্যা ২৮৩ জনের বেশি হতে যাচ্ছে। ১৯৭৩-এর সংসদ ছাড়া পরবর্তী আর কোনো সংসদে আওয়ামী লীগের এতজন সংসদ সদস্য ছিলেন না। সংসদে জাতীয় পার্টি বিরোধী দলের আসনে বসলেও জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরে চলছে গৃহবিবাদ। জাতীয় পার্টি বিরোধী দলের আসনে বসলেও এ দলের সদস্যরা বিরোধী দলের ভূমিকায় কতটা জনগণের দৃষ্টি কেড়ে নিতে পারবেন তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। সাধারণভাবে সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে নানা ইস্যু নিয়ে তর্ক-বিতর্ক, মতবিরোধ, এমনকি তীব্র উত্তেজনা থেকে সংসদ বর্জনের মতো ঘটনাও ঘটে থাকে। এসবই সংসদীয় পদ্ধতিতে আমাদের এখানেও ঘটেছে, অন্য দেশগুলোতেও ঘটতে দেখা যাচ্ছে। গত কয়েকটি সংসদে এ দৃশ্যের অবতারণা খুব বেশি একটা ঘটেনি, এবারো খুব বেশি ঘটবে না- এমনটি মনে করা হচ্ছে। অতীতে যেসব সংসদে বিরোধ, উত্তেজনা এবং সংসদ বর্জনের মতো ঘটনা ঘটেছিল সেগুলোর নানা কারণ ছিল। একটা বিষয় পরিষ্কার, এবারের সংসদে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ এবং অসাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্য নেই। ফলে ওইসব প্রশ্নে কোনো বিরোধ এ সংসদে দেখা যাবে না। বিরোধ এবং দ্বন্দ্ব বিভিন্ন ইস্যুতে হতেই পারে। কিন্তু সেই বিরোধ যেন হয় যুক্তিতর্কের মাধ্যমে প্রকৃত সমাধান মেনে নেয়ার সংস্কৃতিতে।

বাংলাদেশের রাজনীতির বাস্তবতা সম্পর্কে আমরা কমবেশি অবহিত। বড় দুই দল বা জোটের মধ্যে আদর্শের বিরোধ সবচেয়ে বড়। সেই বিরোধের মীমাংসা সহজে হওয়ার নয়। কারণ স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড, ৭ নভেম্বরের ক্ষমতা দখল, ২০০৪-এর ২১ আগস্ট এবং ২০০৫-এর ১৭ আগস্টের ঘটনাবলি আমাদের রাজনীতিকে দুই মেরুতে বিভক্ত করে রেখেছে। কিছু বিদেশি শক্তি এবং দেশের নাগরিক সমাজসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের একটি অংশ বিএনপি ও জামায়াতসহ দক্ষিণ মেরুর শক্তিকে দেশের রাজনীতি, সংসদ এবং সরকারে দেখতে চায় এবং সেই চাওয়ার মধ্যেই তাদের দৃষ্টিতে বহুমত এবং ‘গণতন্ত্রের বিউটি’ রয়েছে বলে মনে করে থাকে। কিন্তু দক্ষিণ মেরুর রাজনীতি প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সরকার কিংবা বিরোধী রাজনীতির মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রকে কতটা এগিয়ে নিতে পারে সেটি মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ’৭৫-এর পর থেকে আমরা সরকারবিরোধী দল কিংবা জাতীয় সংসদে সরকার ও বিরোধী দলে অবস্থান করতে দেখলেও গণতান্ত্রিক রাজনীতি তাতে খুব বেশি অগ্রসর হয়েছে এমনটি দাবি করা যাবে না। সংসদে এবং ময়দানে দুই মেরুর দুই দলের অবস্থান কতটা বিরোধ, দ্ব›দ্ব-সংঘাত এবং আওয়ামী লীগ নিঃশেষিত করে দেয়ার সাক্ষ্য বহন করে- সেটি আঙুল দিয়ে দেখানোর প্রয়োজন পড়ে না। তবে গণতন্ত্রে সরকার এবং বিরোধী দলের আবশ্যকতা অনস্বীকার্য। কিন্তু সেই দুই শক্তিকে হতে হয় অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক, দেশ, মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িকতা এবং পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গির অবস্থান কোনো অবস্থাতেই যেন পরস্পরবিরোধী দুই মেরুতে না থাকে। দুঃখজনক হলেও সত্য, তেমন রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশে তৈরি হয়নি। এখানে পরস্পর আদর্শবিরোধী হওয়ার কারণে নির্বাচন পণ্ড করার চেষ্টা হয়। জোরজবরদস্তি, অগ্নিসংযোগ, মানুষ হত্যা ইত্যাদি ঘটানোর চেষ্টা করা হয়। এটি অনেকটাই বাহুবল প্রদর্শনী ছাড়া অন্য কিছু নয়। গণতন্ত্র হচ্ছে যুক্তির মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রকে আইন, নিয়মকানুন, শৃঙ্খলা এবং উন্নতি, অগ্রগতির দিকে এগিয়ে নেয়ার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা। কিন্তু সেই রাজনৈতিক শক্তির অভাব ৫০ বছরেও ঘুচেনি। বরং সেটি আরো তীব্রতর হয়ে উঠেছে। সে কারণেই নির্বাচন পণ্ড করার চেষ্টা বারবার ঘটেছে। ফলে সংসদে গণতন্ত্রের সংস্কৃতি ধারণকারী রাজনৈতিক শক্তির সমাবেশ ঘটার ক্ষেত্রে নানা ব্যত্যয় ঘটছে।

নতুন দ্বাদশ জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগকে সেই ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে যেখানে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি কোনোভাবেই লঙ্ঘিত হবে না। কোনো আইন আলোচনা-পর্যালোচনা ছাড়া গ্রহণ করা হবে না। সংসদকে কার্যকর করে রাখার মতো উদারতা আওয়ামী লীগকেই দেখাতে হবে। বিরোধী দল যেসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে সেই প্রশ্ন যদি যুক্তিসঙ্গত হয় তাহলে কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। সংসদ যেন কোনো অবস্থাতেই প্রাণহীন, আলোচনাহীন কিংবা যুক্তিতর্কের বাইরে গিয়ে কোনো কার্যক্রম হাতে না নেয়। সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা যেন মুক্তমনে জনগণের কল্যাণে উত্থাপিত যে কোনো বিল, আইন আলোচনা-পর্যালোচনা এবং তর্কবিতর্কের মাধ্যমে গ্রহণ করার সংস্কৃতি চালু করে। সংসদের কার্যাবলি যারা দেখবেন তারা বলতে পারেন যে, এই সংসদ প্রায় এক আদর্শের সদস্যদের নিয়ে হলেও শেষ বিচারে সংসদটি জনগণের কল্যাণে অবদান রাখতে পেরেছে। সেভাবেই কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এ সংসদকে নিয়ে ভেতরে বা বাইরে কেউ যেন ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ না করতে পারে সে ব্যাপারেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সরকারি দলের বলেই যেন কেউ দায়িত্বে অবহেলা না করে সে বিষয়টিও মনে রাখা দরকার। ৫ বছর শেষে দেশের মানুষ যেন বলতে পারে যে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ জনগণের হয়েই কাজ করেছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করেনি। কোনো মন্ত্রী, এমপিকে নিয়ে যেন সংসদের বাইরে মুখরোচক কথা না শোনা যায়। যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হয়ে এসেছেন তারা যেন তা ভুলে না যান। ৫ বছর পর মানুষ যদি মনে করে যে এ সংসদে বড় কোনো বিরোধী দল না থাকার পরও সরকারি দল কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি করেনি, গণতন্ত্র পরিপন্থি কোনো কাজ করেনি। সংসদের আলোচনা-সমালোচনাগুলো যেন মানুষের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে উন্নত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ যেন হয়ে ওঠে গণতন্ত্রের সবচেয়ে উল্লেখ করার মতো পাঠশালা- যেটি গঠনে ব্যতিক্রম, আইন এবং সংসদীয় রীতিনীতির চর্চায়ও নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করে অমর হয়ে থাকে।

 

(অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারীর এ লেখাটি গত ৩০ জানুয়ারি ভোরের কাগজ পত্রিকা ও ভোরের কাগজ অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত। এখনই সময়ের পাঠকদের জন্য কিঞ্চিৎ সংক্ষেপিত আকারে প্রকাশিত হলো।)