ঢাকা ১১:৫৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৩ মার্চ ২০২৪, ২০ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

আবেগের ভাষা বনাম ক্যারিয়ারের ভাষা

  • এখনই সময় ডেস্ক
  • আপডেটের সময় ০৭:৩৬:০৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৪
  • 17

আবেগের ভাষা বনাম ক্যারিয়ারের ভাষা

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা

 

ফেব্রুয়ারি মাস এসেছে। অমর একুশে বই মেলাও শুরু হয়েছে। নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও শুরু করেছে বিভিন্ন সংগঠন। সামনে একুশে ফেব্রুয়ারি, মহান শহীদ দিবস। ১৯৫২ সালের এই দিনে ঢাকায় কয়েকজন তরুণের বুকের রক্ত ঝরেছিল বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে। প্রতিবছর ওই দিনটি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্র বন্ধ থাকে।

রাষ্ট্রীয়ভাবে ভাষা শহীদদের প্রতি সম্মান জানানো হয় প্রথম প্রহরে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সব বয়সের মানুষ ভোরবেলা হাতে ফুল নিয়ে জামায় বা শাড়িতে কালো ব্যাজ পরে খালি পায়ে হেঁটে শহীদ মিনারে যান শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশে শ্রদ্ধা জানাতে। অনেক মানুষ যান প্রভাতফেরিতে।

দিনটি জাতিসংঘের ঘোষণায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা পেয়েছে। আমরা জোর গলায় দাবি করতে পারি যে, বাঙালির আত্মত্যাগে পৃথিবীর সব আঞ্চলিক ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা দাবি করি, একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালিদের কাছে শুধু একটি দিন বা একটি বিশেষ দিনের ঘটনাপ্রবাহ নয়। বাঙালির কাছে এই দিন তারচেয়েও বড় কিছু।

ফোনে, ফেসবুকে আমরা এই দিনের কথা বলতে গিয়ে বলি ‘মোদের গরব মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা।’ আবার এই প্রশ্নও ওঠে যে, সারা বছর কি নিজের ভাষাকে আমরা ঠিকঠাক গুরুত্ব দিই?

এই উপলব্ধিটা বাস্তব। নিজের ভাষা নিয়ে গর্ব থাকলেও তরুণদের কাছে ক্যারিয়ারের ভাষা ইংরেজি। এখনো বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের বেশিরভাগ বই পড়তে হয় ইংরেজিতে। বাংলায় বিশেষায়িত বই লেখা হচ্ছে কম। প্রশাসনিক ভাষা বাংলা হলেও ইংরেজি পারাটাই দক্ষতা।

আমাদের ইংরেজিসহ অন্যান্য বিদেশি ভাষাও শিখতে হবে। তবে তা নিশ্চয়ই বাংলাকে দূরে ঠেলে দিয়ে নয়। প্রতিযোগিতা আর পেশাদারিত্বের চাপে নিজের ভাষার প্রতি অবহেলা বহুদিন ধরে চলছে।

সারা বছর কি নিজের ভাষাকে আমরা ঠিকঠাক গুরুত্ব দেই? এই উপলব্ধিটা বাস্তব। নিজের ভাষা নিয়ে গর্ব থাকলেও তরুণদের কাছে ক্যারিয়ারের ভাষা ইংরেজি।

অতি সাধারণ ঘরের বাবা-মাও বাড়ির ছেলে বা মেয়েটাকে বাংলা মাধ্যমের বদলে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করানোর চেষ্টা করছেন। একেবারে ব্রিটিশ কারিকুলামের ইংরেজি মাধ্যম না হলেও বাংলাদেশের সিলেবাসের ইংরেজি ভার্সনে পড়াচ্ছেন। অর্থাৎ মাতৃভাষাটা নিয়ে অতটা মাথাব্যথা নেই তাদের।

বই মেলায় ভিড় দেখে, বইয়ের সংখ্যা দেখে বলা যাবে না যে, বাংলা ভাষার অবস্থাটা খারাপ। বাংলা ভাষা মৃতপ্রায় বা বাংলা ভাষা ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ছে তাও নয়। কারণ হলো দেশের বিরাট জনসংখ্যার বড় অংশটাই সন্তানদের বাংলা মাধ্যমে পড়াচ্ছেন, নিজেরা বাংলা চর্চার মধ্যেই আছেন।

তবে বাংলা ক্ষমতা কাঠামোর ভাষা নয়। আমার নিজের দেখা যে, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর বা উপজেলা পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিরাও সন্তানদের ঢাকায় বা বড় শহরে রেখে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াচ্ছেন এবং পড়ালেখা শেষে বিদেশ পাঠিয়ে দিচ্ছেন।

সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতির চর্চায় বাঙালির কাছে আজও বাংলায় মূল ভাষা। কিন্তু বাংলা কাজের ভাষা হয়ে উঠতে পারছে না। বাংলাকে শিক্ষা ও পেশার প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যবহার্য করে তোলার প্রয়াস আমরা নিতে পারিনি। এর একটা বড় কারণ হলো, বাংলা ভাষায় সব ধরনের উচ্চশিক্ষার সুযোগ এখনও তৈরি হয়নি।

এবার আসা যাক, মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য যারা জীবন দিয়েছেন সেই ভাষা শহীদদের প্রসঙ্গে। এত ঘটা করে আমরা দিবস পালন করি, কারণ একাত্তর সালে আমরা এই যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছিলাম তার বীজটি বোনা হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই। কিন্তু এত যে আমরা তা নিয়ে কথা বলি, ঘুরে ফিরে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার ও শফিউর ছাড়া আর কোনো ভাষা শহীদের নাম পাই না।

সারা বছর শহীদ মিনার অবহেলায় করুণভাবে পড়ে থাকে। আড্ডা চলে বখাটেদের। এই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারকে একটি ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা কি খুব কঠিন?

ভাষা সৈনিক আহমদ রফিক তার ‘একুশ থেকে একাত্তর’ বইয়ে আরও কিছু নামের কথা উল্লেখ করেছিলেন যারা শহীদ হয়েছিলেন। শুধু একুশে ফেব্রুয়ারি নয়, ভাষার দাবিতে মিছিল হয়েছে পরদিন এবং আরও কয়েকজনের ওপর পাকিস্তানি পুলিশ গুলি চালায়। ঢাকা শুধু নয়, ঢাকার বাইরেও হত্যার ঘটনা ঘটেছে।

মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি’ কবিতায় ৪০টি লাশের কথা বলেছেন। কিন্তু সেইসব শহীদদের নাম কোথায়? সংখ্যাটি কি তাহলে ৪০ নাকি আরও বেশি? গবেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদের এক লেখায় বলেছেন, ‘পাকিস্তানের নির্বাসিত লেখক লাল খান তার পাকিস্তানস আদার স্টোরি: দ্য ১৯৬৮-৬৯ রেভল্যুশন বইয়ে লিখেছেন, পুলিশের গুলিতে ২৬ জন নিহত এবং ৪০০ জনের মতো আহত হয়েছিলেন।’ বইটি ২০০৮ সালে লাহোরে প্রকাশিত হয়।

অর্থাৎ যেকোনো বিচারে ভাষা শহীদের সংখ্যা উচ্চারিত পাঁচজনের চাইতে অনেক বেশি। গবেষণা করে সেই সত্যটা আজও বের হলো না। ভাষা আন্দোলনে প্রাণ দিয়েছিলেন একেবারে সাধারণ মানুষ এবং সেইজন্যই হয়তো ইতিহাসে তারা উপেক্ষিত।

একুশ এলে ধোয়া মোছা করা হয় ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। এই মিনারের আদলে সারা দেশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য মিনার। সবকিছু সেই একদিনের জন্য। সারা বছর শহীদ মিনার অবহেলায় করুণভাবে পড়ে থাকে। আড্ডা চলে বখাটেদের। এই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারকে একটি ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা কি খুব কঠিন? পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখলে এই শহীদ মিনার সারা বছরই মাথা উঁচু করে মর্যাদা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।

বাংলাদেশে যারা বিদেশ থেকে আসেন তাদের জন্য একটি দর্শনীয় স্থান হতে পারে। স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা সফরের স্থান হতে পারে এটি। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে এখানে বই পুস্তকেও বিক্রি হতে পারে। কোনো উদ্যোগ নেই, শুধু আছে লোক দেখানো আনুষ্ঠানিকতা।

শুধু শহীদ দিবসে শহীদ মিনারে যাওয়া, সারা বছর ভুলে থাকা—এই ভাবনা থেকে সরে আসা প্রয়োজন। যেহেতু এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতরে আছে, উদ্যোগটি তাদেরই নিতে হবে। স্থানটি হয়ে উঠুক সারা বছর শ্রদ্ধা জানানোর স্থান, ইতিহাস উপলব্ধি করার মিনার।

 

(গ্লোবাল টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজার এ লেখাটি আজ ০১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা পোস্ট পত্রিকা ও ঢাকা পোস্ট অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত। এখনই সময়ের পাঠকদের জন্য কিঞ্চিৎ সংক্ষেপিত আকারে প্রকাশিত হলো।)

মন্তব্য লিখুন

আবেগের ভাষা বনাম ক্যারিয়ারের ভাষা

আপডেটের সময় ০৭:৩৬:০৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা

 

ফেব্রুয়ারি মাস এসেছে। অমর একুশে বই মেলাও শুরু হয়েছে। নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও শুরু করেছে বিভিন্ন সংগঠন। সামনে একুশে ফেব্রুয়ারি, মহান শহীদ দিবস। ১৯৫২ সালের এই দিনে ঢাকায় কয়েকজন তরুণের বুকের রক্ত ঝরেছিল বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে। প্রতিবছর ওই দিনটি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্র বন্ধ থাকে।

রাষ্ট্রীয়ভাবে ভাষা শহীদদের প্রতি সম্মান জানানো হয় প্রথম প্রহরে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সব বয়সের মানুষ ভোরবেলা হাতে ফুল নিয়ে জামায় বা শাড়িতে কালো ব্যাজ পরে খালি পায়ে হেঁটে শহীদ মিনারে যান শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশে শ্রদ্ধা জানাতে। অনেক মানুষ যান প্রভাতফেরিতে।

দিনটি জাতিসংঘের ঘোষণায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা পেয়েছে। আমরা জোর গলায় দাবি করতে পারি যে, বাঙালির আত্মত্যাগে পৃথিবীর সব আঞ্চলিক ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা দাবি করি, একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালিদের কাছে শুধু একটি দিন বা একটি বিশেষ দিনের ঘটনাপ্রবাহ নয়। বাঙালির কাছে এই দিন তারচেয়েও বড় কিছু।

ফোনে, ফেসবুকে আমরা এই দিনের কথা বলতে গিয়ে বলি ‘মোদের গরব মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা।’ আবার এই প্রশ্নও ওঠে যে, সারা বছর কি নিজের ভাষাকে আমরা ঠিকঠাক গুরুত্ব দিই?

এই উপলব্ধিটা বাস্তব। নিজের ভাষা নিয়ে গর্ব থাকলেও তরুণদের কাছে ক্যারিয়ারের ভাষা ইংরেজি। এখনো বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের বেশিরভাগ বই পড়তে হয় ইংরেজিতে। বাংলায় বিশেষায়িত বই লেখা হচ্ছে কম। প্রশাসনিক ভাষা বাংলা হলেও ইংরেজি পারাটাই দক্ষতা।

আমাদের ইংরেজিসহ অন্যান্য বিদেশি ভাষাও শিখতে হবে। তবে তা নিশ্চয়ই বাংলাকে দূরে ঠেলে দিয়ে নয়। প্রতিযোগিতা আর পেশাদারিত্বের চাপে নিজের ভাষার প্রতি অবহেলা বহুদিন ধরে চলছে।

সারা বছর কি নিজের ভাষাকে আমরা ঠিকঠাক গুরুত্ব দেই? এই উপলব্ধিটা বাস্তব। নিজের ভাষা নিয়ে গর্ব থাকলেও তরুণদের কাছে ক্যারিয়ারের ভাষা ইংরেজি।

অতি সাধারণ ঘরের বাবা-মাও বাড়ির ছেলে বা মেয়েটাকে বাংলা মাধ্যমের বদলে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করানোর চেষ্টা করছেন। একেবারে ব্রিটিশ কারিকুলামের ইংরেজি মাধ্যম না হলেও বাংলাদেশের সিলেবাসের ইংরেজি ভার্সনে পড়াচ্ছেন। অর্থাৎ মাতৃভাষাটা নিয়ে অতটা মাথাব্যথা নেই তাদের।

বই মেলায় ভিড় দেখে, বইয়ের সংখ্যা দেখে বলা যাবে না যে, বাংলা ভাষার অবস্থাটা খারাপ। বাংলা ভাষা মৃতপ্রায় বা বাংলা ভাষা ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ছে তাও নয়। কারণ হলো দেশের বিরাট জনসংখ্যার বড় অংশটাই সন্তানদের বাংলা মাধ্যমে পড়াচ্ছেন, নিজেরা বাংলা চর্চার মধ্যেই আছেন।

তবে বাংলা ক্ষমতা কাঠামোর ভাষা নয়। আমার নিজের দেখা যে, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর বা উপজেলা পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিরাও সন্তানদের ঢাকায় বা বড় শহরে রেখে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াচ্ছেন এবং পড়ালেখা শেষে বিদেশ পাঠিয়ে দিচ্ছেন।

সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতির চর্চায় বাঙালির কাছে আজও বাংলায় মূল ভাষা। কিন্তু বাংলা কাজের ভাষা হয়ে উঠতে পারছে না। বাংলাকে শিক্ষা ও পেশার প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যবহার্য করে তোলার প্রয়াস আমরা নিতে পারিনি। এর একটা বড় কারণ হলো, বাংলা ভাষায় সব ধরনের উচ্চশিক্ষার সুযোগ এখনও তৈরি হয়নি।

এবার আসা যাক, মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য যারা জীবন দিয়েছেন সেই ভাষা শহীদদের প্রসঙ্গে। এত ঘটা করে আমরা দিবস পালন করি, কারণ একাত্তর সালে আমরা এই যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছিলাম তার বীজটি বোনা হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই। কিন্তু এত যে আমরা তা নিয়ে কথা বলি, ঘুরে ফিরে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার ও শফিউর ছাড়া আর কোনো ভাষা শহীদের নাম পাই না।

সারা বছর শহীদ মিনার অবহেলায় করুণভাবে পড়ে থাকে। আড্ডা চলে বখাটেদের। এই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারকে একটি ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা কি খুব কঠিন?

ভাষা সৈনিক আহমদ রফিক তার ‘একুশ থেকে একাত্তর’ বইয়ে আরও কিছু নামের কথা উল্লেখ করেছিলেন যারা শহীদ হয়েছিলেন। শুধু একুশে ফেব্রুয়ারি নয়, ভাষার দাবিতে মিছিল হয়েছে পরদিন এবং আরও কয়েকজনের ওপর পাকিস্তানি পুলিশ গুলি চালায়। ঢাকা শুধু নয়, ঢাকার বাইরেও হত্যার ঘটনা ঘটেছে।

মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি’ কবিতায় ৪০টি লাশের কথা বলেছেন। কিন্তু সেইসব শহীদদের নাম কোথায়? সংখ্যাটি কি তাহলে ৪০ নাকি আরও বেশি? গবেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদের এক লেখায় বলেছেন, ‘পাকিস্তানের নির্বাসিত লেখক লাল খান তার পাকিস্তানস আদার স্টোরি: দ্য ১৯৬৮-৬৯ রেভল্যুশন বইয়ে লিখেছেন, পুলিশের গুলিতে ২৬ জন নিহত এবং ৪০০ জনের মতো আহত হয়েছিলেন।’ বইটি ২০০৮ সালে লাহোরে প্রকাশিত হয়।

অর্থাৎ যেকোনো বিচারে ভাষা শহীদের সংখ্যা উচ্চারিত পাঁচজনের চাইতে অনেক বেশি। গবেষণা করে সেই সত্যটা আজও বের হলো না। ভাষা আন্দোলনে প্রাণ দিয়েছিলেন একেবারে সাধারণ মানুষ এবং সেইজন্যই হয়তো ইতিহাসে তারা উপেক্ষিত।

একুশ এলে ধোয়া মোছা করা হয় ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। এই মিনারের আদলে সারা দেশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য মিনার। সবকিছু সেই একদিনের জন্য। সারা বছর শহীদ মিনার অবহেলায় করুণভাবে পড়ে থাকে। আড্ডা চলে বখাটেদের। এই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারকে একটি ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা কি খুব কঠিন? পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখলে এই শহীদ মিনার সারা বছরই মাথা উঁচু করে মর্যাদা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।

বাংলাদেশে যারা বিদেশ থেকে আসেন তাদের জন্য একটি দর্শনীয় স্থান হতে পারে। স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা সফরের স্থান হতে পারে এটি। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে এখানে বই পুস্তকেও বিক্রি হতে পারে। কোনো উদ্যোগ নেই, শুধু আছে লোক দেখানো আনুষ্ঠানিকতা।

শুধু শহীদ দিবসে শহীদ মিনারে যাওয়া, সারা বছর ভুলে থাকা—এই ভাবনা থেকে সরে আসা প্রয়োজন। যেহেতু এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতরে আছে, উদ্যোগটি তাদেরই নিতে হবে। স্থানটি হয়ে উঠুক সারা বছর শ্রদ্ধা জানানোর স্থান, ইতিহাস উপলব্ধি করার মিনার।

 

(গ্লোবাল টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজার এ লেখাটি আজ ০১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা পোস্ট পত্রিকা ও ঢাকা পোস্ট অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত। এখনই সময়ের পাঠকদের জন্য কিঞ্চিৎ সংক্ষেপিত আকারে প্রকাশিত হলো।)