ঢাকা ০৫:০০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৩ মার্চ ২০২৪, ১৯ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা

হীরেন পণ্ডিত

 

নির্বাচনের পর দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সমন্বয়ের ভিত্তিতে এটির ওপর কাজ করতে বলেছেন। তিনি মন্ত্রীদের কাছ থেকে সবশেষ অবস্থা জেনেছেন, মন্ত্রীরা কে কি কাজ করেছেন সেটি জানিয়েছেন এবং তাদের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। রমজানে যে পণ্যগুলোর দরকার হয়, বিশেষ করে খেজুর, ভোজ্য তেল, চিনি ও চাল, এই চারটি পণ্যের শুল্কহার হ্রাস করার জন্য এনবিআরকে নির্দেশনা দিয়েছেন। সেটি নিয়ে এখন তারা কাজ করছেন। কী পরিমাণ কমানো হবে সেটি এনবিআর হিসাব করে দেখবে, যাতে করে দ্রব্যমূল্যের চাপটা মানুষের ওপর কম থাকে। আসন্ন রমজান উপলক্ষে ভোজ্য তেল, চিনি, খেজুর ও চালের শুল্কহার কমাতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২৯ জানুয়ারি মন্ত্রিসভা বৈঠকে তিনি এ নির্দেশ দেন বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। এ ছাড়া পবিত্র এ মাসজুড়ে বাজারে পণ্য সরবরাহের ঘাটতি যেন না থাকে সেই বিষয়েও নজরদারি করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আসন্ন রমজান উপলক্ষে ভোজ্য তেল, চিনি, খেজুর ও চালের ওপর শুল্ক কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন বাজারে যেন সরবরাহ ও চাহিদার ক্ষেত্রে কোনো ঘাটতি না থাকে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। গত বছর এই সময়ের তুলনায় এখন এলসি ওপেনের হার অনেক বেশি আছে এবং খাদ্য মজুদের পরিমাণ অনেক বেশি আছে, সেই তথ্যগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে। এ বছর এখন পর্যন্ত ৪৪ হাজার ৭৩৪ টন খেজুর, ১ লাখ ২৫ হাজার ৩৭৪ টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল, ৩ লাখ ৮৭ হাজার ১৩৮ টন চিনি আমদানির এলসি ওপেন করা হয়েছে। রমজান ঘিরে ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ আগের তুলনায় বেড়েছে। দেশের বৃহৎ পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে সরবরাহ বাড়ায় দাম কমেছে ছোলা, মসুর ডাল ও মোটরসহ মসলা জাতীয় পণ্যের। তবে কিছুটা বেড়েছে মুগডালের। গত ছয় মাসে ছোলা আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৩৯ হাজার ২২৭ টন। খেজুর আমদানি হয়েছে ৪৪ হাজার ৬৩৪ টন।

কয়েক মাস ধরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে চরম বিপাকে পড়েছেন দেশের সাধারণ মানুষ। শ্রমজীবীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। চাল, ডাল, চিনি, তেলসহ প্রায় প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের দাম এখন বেশি। সবকিছুর দামই ঊর্ধ্বমুখী। ফলে পুষ্টিহীনতা নিয়ে আমাদের দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে কি না তা ভেবে দেখতে হবে সবাইকে। অথচ তাদের কর্মক্ষমতা অথবা কর্মদক্ষতা স্বাভাবিকভাবেই কম থাকে। এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ, উন্নয়নের ছোঁয়া মাটি থেকে আকাশে, যেদিকে তাকানো যায়, তা দৃশ্যমান। এ দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। নির্বাচন শেষে নতুনভাবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন দ্রব্যমূল্য ও মুদ্রাস্ফীতিসহ সব সমস্যাগুলোকে সহনশীল মাত্রায় রাখার জন্য। দ্রব্যমূল্য কীভাবে হ্রাস করা যায় সেদিকেও লক্ষ্য রয়েছে তার। বর্তমান অবস্থা দীর্ঘ সময় ধরে বিরাজমান থাকলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনে আরও বেশি নাভিশ্বাস উঠবে বলে সবার আশঙ্কা। অভিযোগ আছে, সিন্ডিকেট করে বাজারে পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এর অবসান হওয়া জরুরি। বাজারের অস্থিরতা দূর করতে হলে অবশ্যই অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট দমন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিত্যপণ্যের বাজারে কেউ যেন কারসাজি না করে, সেদিকে নজর দিতে হবে। খাদ্য মন্ত্রণালয়কে বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে। যারা অনিয়ম করছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের লাগাম টেনে ধরতে সরকার কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। প্রয়োজনে আরও কঠোর হতে হবে।

নতুন সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে দ্রব্যমূল্য হ্রাস ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। আগামী জুন মাসের মধ্যে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামানো একটা বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে প্রথমেই নতুন সরকারের অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়ন অবিলম্বে শুরু করা।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার আরও বেশ হারে বাড়াতে হবে, পাশাপাশি সার্বিক অর্থনীতির স্বার্থে দরকার বাজার তদারকি, ব্যাংক খাতের সংস্কার, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেওয়া এবং ব্যবসাবান্ধব বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টি করা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে সুদের হার বাড়ানো দরকার এবং সুদহার বৃদ্ধির মাধ্যমেই মূল্যস্ফীতি কমাতে হবে। সুদহার বাড়ালে ডলারের বিনিময় হারেও স্থিতিশীলতা ফিরবে, ব্যাংকের তারল্য সংকটেরও সমাধান হবে। তখন বাইরে থাকা টাকাও ব্যাংকে ফিরে আসবে।

বিশ্বব্যাপী পণ্য মূল্যের গতিবিধি, অভ্যন্তরীণ আর্থিক ও মুদ্রানীতির অবস্থান এবং বিনিময় হারের অস্থিরতা থেকে উদ্ভূত ঝুঁকিসহ বিভিন্ন কারণে মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি অনিশ্চয়তার বিষয়। জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতির প্রভাবে পরিবহন ব্যয় ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কারণে ব্যবসায় প্রভাব পরতে পারে। পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও খাদ্যের দামে মূল্যস্ফীতির প্রভাব রয়েছেই।

বিভিন্ন পর্যালোচনার মাধ্যমে দেশের ক্রমাগত দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির যেসব কারণ বেরিয়ে এসেছে, তা হলো-ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির একটি প্রধান কারণ। একশ্রেণির অতি মুনাফালোভী অসাধু ব্যবসায়ী নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মজুদ গড়ে তুলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে বলে প্রায়ই অভিযোগ ওঠে।

সরকারও বিভিন্ন সময় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির জন্য এসব ব্যবসায়ীর সিন্ডিকেটকেই দায়ী করেছে। শিল্প মালিক, উদ্যোক্তা, উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের ওপর মোটা অঙ্কের চাঁদাবাজি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির আরেকটি কারণ। ব্যবসায়ী এবং উৎপাদকরা চাঁদাবাজদের দেওয়া চাঁদার ক্ষতি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করে পুষিয়ে নেন। শুল্ক বৃদ্ধির কারণেও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়। বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং তদারকির ক্ষেত্রে সরকারের অমনোযোগিতা ও ব্যর্থতা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির একটি বিরাট কারণ। টিসিবির মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে খাদ্যপণ্য সরবরাহের যে ব্যবস্থা করা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে ভালো কাজ। শহরাঞ্চলের কয়েকটি স্থানে টিসিবিকে খাদ্যপণ্য বিক্রি করতে দেখা যাচ্ছে। দিন দিন এই লাইন আরও লম্বা হতেও দেখা যাচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোকজন দাঁড়িয়ে থাকে। ভোজ্য তেল, চাল, চিনি, পেঁয়াজ ইত্যাদি পণ্য কম মূল্যে নেওয়ার জন্য তারা এভাবে লাইনে দাঁড়াচ্ছে। দরিদ্র মানুষ স্বল্প আয়ে চলতে পারছে না কিংবা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। সুতরাং বাজার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এসব দরিদ্র মানুষদের জন্য জন্য কিছু ব্যবস্থা করতে হবে, তাদের সরকারি সহায়তা দিয়ে যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের করণীয় হচ্ছে টিসিবির মাধ্যমে পণ্য বিক্রি আরও বাড়ানো।

একটা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে চলছে বিশ্ব। চিন্তা করতে হবে যে দরিদ্র মানুষদের কীভাবে কম মূল্যে খাদ্য পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে। তবে জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপচয় কমিয়ে আনতে পারলে সাশ্রয় করা সম্ভব। আমাদের দেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ সেগুলো নষ্ট হয়ে না যায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। বাজার মনিটরিং জোরদার করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা যেতে পারে কিন্তু তাতে দীর্ঘমেয়াদি তেমন কোনো সমাধান পাওয়া যাবে না। দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে হলে প্রয়োজন একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করা। ক্ষুদ্র আমদানিকারকদের সক্রিয় করে দেশব্যাপী আমদানি অবারিত করার মাধ্যমে এবং সে সঙ্গে দেশের

কৃষিপণ্য আধুনিক পদ্ধতিতে স্টোরেজ করার সুযোগ সৃষ্টি করার পাশাপাশি সুশৃঙ্খল বাজার ব্যবস্থার প্রবর্তন করলে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার স্থায়ী সমাধান খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। আমাদের বড় অংশ সাধারণ খেটে খাওয়া অনির্দিষ্ট পেশায় নিয়োজিত মানুষ। তাদের দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। পণ্যে ভর্তুকি দিয়ে হোক, কম মূল্যে পণ্য কেনার কার্ড দিয়ে হোক, ওএমএসের মাধ্যমে পণ্য কিনতে সহায়তা হোক, সরাসরি আর্থিক সহায়তা হোক, কাজের বিনিময়ে খাদ্য হোক, সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বাড়িয়ে হোক যেকোনোভাবে নিম্নবিত্ত মানুষকে সহায়তা করতে হবে। যত দিন পর্যন্ত বিশ্ব বাজারে পণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে না আসে এবং আমাদের দেশের উৎপাদিত ভোগ্য পণ্যের দাম না কমে, তত দিন পর্যন্ত এ যাত্রা অব্যাহত রাখতে হবে।
একটি উন্নত স্থিতিশীল ও টেকসই অর্থনীতি সারা দেশের উন্নয়নের জন্য দরকার, যেখানে উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানকে সমানভাবে গুরুত্ব হবে। বেসরকারি খাতকে গুরুত্ব দিয়ে সরকার কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করে চলছে। কেননা সরকারের একার পক্ষে কর্মসংস্থান অর্জন করা সম্ভব নয়। সবার জন্য কর্মসংস্থানের বিষয়টি মাথায় রেখে সক্ষমতাকে বিচেনায় আনতে হবে। এতে সুন্দর একটি সমাজ তৈরি করা সহজ হবে এবং দেশ আরও সামনের দিকে এগিয়ে যাবে, পরিচিত হবে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা হিসেবে।

 

(কলাম লেখক হীরেন পন্ডিতের লেখা এ কলামটি আজ ০২ ফেব্রুয়ারি দৈনিক সময়ের আলো ও সময়ের আলো অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত। এখনই সময়ের পাঠকদের জন্য কিঞ্চিৎ সংক্ষেপিত আকারে প্রকাশিত হলো।)

মন্তব্য লিখুন

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা

আপডেটের সময় ০৭:৫২:৪৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

হীরেন পণ্ডিত

 

নির্বাচনের পর দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সমন্বয়ের ভিত্তিতে এটির ওপর কাজ করতে বলেছেন। তিনি মন্ত্রীদের কাছ থেকে সবশেষ অবস্থা জেনেছেন, মন্ত্রীরা কে কি কাজ করেছেন সেটি জানিয়েছেন এবং তাদের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। রমজানে যে পণ্যগুলোর দরকার হয়, বিশেষ করে খেজুর, ভোজ্য তেল, চিনি ও চাল, এই চারটি পণ্যের শুল্কহার হ্রাস করার জন্য এনবিআরকে নির্দেশনা দিয়েছেন। সেটি নিয়ে এখন তারা কাজ করছেন। কী পরিমাণ কমানো হবে সেটি এনবিআর হিসাব করে দেখবে, যাতে করে দ্রব্যমূল্যের চাপটা মানুষের ওপর কম থাকে। আসন্ন রমজান উপলক্ষে ভোজ্য তেল, চিনি, খেজুর ও চালের শুল্কহার কমাতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২৯ জানুয়ারি মন্ত্রিসভা বৈঠকে তিনি এ নির্দেশ দেন বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। এ ছাড়া পবিত্র এ মাসজুড়ে বাজারে পণ্য সরবরাহের ঘাটতি যেন না থাকে সেই বিষয়েও নজরদারি করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আসন্ন রমজান উপলক্ষে ভোজ্য তেল, চিনি, খেজুর ও চালের ওপর শুল্ক কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন বাজারে যেন সরবরাহ ও চাহিদার ক্ষেত্রে কোনো ঘাটতি না থাকে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। গত বছর এই সময়ের তুলনায় এখন এলসি ওপেনের হার অনেক বেশি আছে এবং খাদ্য মজুদের পরিমাণ অনেক বেশি আছে, সেই তথ্যগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে। এ বছর এখন পর্যন্ত ৪৪ হাজার ৭৩৪ টন খেজুর, ১ লাখ ২৫ হাজার ৩৭৪ টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল, ৩ লাখ ৮৭ হাজার ১৩৮ টন চিনি আমদানির এলসি ওপেন করা হয়েছে। রমজান ঘিরে ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ আগের তুলনায় বেড়েছে। দেশের বৃহৎ পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে সরবরাহ বাড়ায় দাম কমেছে ছোলা, মসুর ডাল ও মোটরসহ মসলা জাতীয় পণ্যের। তবে কিছুটা বেড়েছে মুগডালের। গত ছয় মাসে ছোলা আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৩৯ হাজার ২২৭ টন। খেজুর আমদানি হয়েছে ৪৪ হাজার ৬৩৪ টন।

কয়েক মাস ধরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে চরম বিপাকে পড়েছেন দেশের সাধারণ মানুষ। শ্রমজীবীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। চাল, ডাল, চিনি, তেলসহ প্রায় প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের দাম এখন বেশি। সবকিছুর দামই ঊর্ধ্বমুখী। ফলে পুষ্টিহীনতা নিয়ে আমাদের দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে কি না তা ভেবে দেখতে হবে সবাইকে। অথচ তাদের কর্মক্ষমতা অথবা কর্মদক্ষতা স্বাভাবিকভাবেই কম থাকে। এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ, উন্নয়নের ছোঁয়া মাটি থেকে আকাশে, যেদিকে তাকানো যায়, তা দৃশ্যমান। এ দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। নির্বাচন শেষে নতুনভাবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন দ্রব্যমূল্য ও মুদ্রাস্ফীতিসহ সব সমস্যাগুলোকে সহনশীল মাত্রায় রাখার জন্য। দ্রব্যমূল্য কীভাবে হ্রাস করা যায় সেদিকেও লক্ষ্য রয়েছে তার। বর্তমান অবস্থা দীর্ঘ সময় ধরে বিরাজমান থাকলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনে আরও বেশি নাভিশ্বাস উঠবে বলে সবার আশঙ্কা। অভিযোগ আছে, সিন্ডিকেট করে বাজারে পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এর অবসান হওয়া জরুরি। বাজারের অস্থিরতা দূর করতে হলে অবশ্যই অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট দমন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিত্যপণ্যের বাজারে কেউ যেন কারসাজি না করে, সেদিকে নজর দিতে হবে। খাদ্য মন্ত্রণালয়কে বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে। যারা অনিয়ম করছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের লাগাম টেনে ধরতে সরকার কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। প্রয়োজনে আরও কঠোর হতে হবে।

নতুন সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে দ্রব্যমূল্য হ্রাস ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। আগামী জুন মাসের মধ্যে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামানো একটা বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে প্রথমেই নতুন সরকারের অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়ন অবিলম্বে শুরু করা।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার আরও বেশ হারে বাড়াতে হবে, পাশাপাশি সার্বিক অর্থনীতির স্বার্থে দরকার বাজার তদারকি, ব্যাংক খাতের সংস্কার, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেওয়া এবং ব্যবসাবান্ধব বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টি করা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে সুদের হার বাড়ানো দরকার এবং সুদহার বৃদ্ধির মাধ্যমেই মূল্যস্ফীতি কমাতে হবে। সুদহার বাড়ালে ডলারের বিনিময় হারেও স্থিতিশীলতা ফিরবে, ব্যাংকের তারল্য সংকটেরও সমাধান হবে। তখন বাইরে থাকা টাকাও ব্যাংকে ফিরে আসবে।

বিশ্বব্যাপী পণ্য মূল্যের গতিবিধি, অভ্যন্তরীণ আর্থিক ও মুদ্রানীতির অবস্থান এবং বিনিময় হারের অস্থিরতা থেকে উদ্ভূত ঝুঁকিসহ বিভিন্ন কারণে মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি অনিশ্চয়তার বিষয়। জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতির প্রভাবে পরিবহন ব্যয় ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কারণে ব্যবসায় প্রভাব পরতে পারে। পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও খাদ্যের দামে মূল্যস্ফীতির প্রভাব রয়েছেই।

বিভিন্ন পর্যালোচনার মাধ্যমে দেশের ক্রমাগত দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির যেসব কারণ বেরিয়ে এসেছে, তা হলো-ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির একটি প্রধান কারণ। একশ্রেণির অতি মুনাফালোভী অসাধু ব্যবসায়ী নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মজুদ গড়ে তুলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে বলে প্রায়ই অভিযোগ ওঠে।

সরকারও বিভিন্ন সময় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির জন্য এসব ব্যবসায়ীর সিন্ডিকেটকেই দায়ী করেছে। শিল্প মালিক, উদ্যোক্তা, উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের ওপর মোটা অঙ্কের চাঁদাবাজি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির আরেকটি কারণ। ব্যবসায়ী এবং উৎপাদকরা চাঁদাবাজদের দেওয়া চাঁদার ক্ষতি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করে পুষিয়ে নেন। শুল্ক বৃদ্ধির কারণেও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়। বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং তদারকির ক্ষেত্রে সরকারের অমনোযোগিতা ও ব্যর্থতা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির একটি বিরাট কারণ। টিসিবির মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে খাদ্যপণ্য সরবরাহের যে ব্যবস্থা করা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে ভালো কাজ। শহরাঞ্চলের কয়েকটি স্থানে টিসিবিকে খাদ্যপণ্য বিক্রি করতে দেখা যাচ্ছে। দিন দিন এই লাইন আরও লম্বা হতেও দেখা যাচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোকজন দাঁড়িয়ে থাকে। ভোজ্য তেল, চাল, চিনি, পেঁয়াজ ইত্যাদি পণ্য কম মূল্যে নেওয়ার জন্য তারা এভাবে লাইনে দাঁড়াচ্ছে। দরিদ্র মানুষ স্বল্প আয়ে চলতে পারছে না কিংবা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। সুতরাং বাজার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এসব দরিদ্র মানুষদের জন্য জন্য কিছু ব্যবস্থা করতে হবে, তাদের সরকারি সহায়তা দিয়ে যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের করণীয় হচ্ছে টিসিবির মাধ্যমে পণ্য বিক্রি আরও বাড়ানো।

একটা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে চলছে বিশ্ব। চিন্তা করতে হবে যে দরিদ্র মানুষদের কীভাবে কম মূল্যে খাদ্য পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে। তবে জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপচয় কমিয়ে আনতে পারলে সাশ্রয় করা সম্ভব। আমাদের দেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ সেগুলো নষ্ট হয়ে না যায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। বাজার মনিটরিং জোরদার করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা যেতে পারে কিন্তু তাতে দীর্ঘমেয়াদি তেমন কোনো সমাধান পাওয়া যাবে না। দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে হলে প্রয়োজন একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করা। ক্ষুদ্র আমদানিকারকদের সক্রিয় করে দেশব্যাপী আমদানি অবারিত করার মাধ্যমে এবং সে সঙ্গে দেশের

কৃষিপণ্য আধুনিক পদ্ধতিতে স্টোরেজ করার সুযোগ সৃষ্টি করার পাশাপাশি সুশৃঙ্খল বাজার ব্যবস্থার প্রবর্তন করলে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার স্থায়ী সমাধান খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। আমাদের বড় অংশ সাধারণ খেটে খাওয়া অনির্দিষ্ট পেশায় নিয়োজিত মানুষ। তাদের দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। পণ্যে ভর্তুকি দিয়ে হোক, কম মূল্যে পণ্য কেনার কার্ড দিয়ে হোক, ওএমএসের মাধ্যমে পণ্য কিনতে সহায়তা হোক, সরাসরি আর্থিক সহায়তা হোক, কাজের বিনিময়ে খাদ্য হোক, সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বাড়িয়ে হোক যেকোনোভাবে নিম্নবিত্ত মানুষকে সহায়তা করতে হবে। যত দিন পর্যন্ত বিশ্ব বাজারে পণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে না আসে এবং আমাদের দেশের উৎপাদিত ভোগ্য পণ্যের দাম না কমে, তত দিন পর্যন্ত এ যাত্রা অব্যাহত রাখতে হবে।
একটি উন্নত স্থিতিশীল ও টেকসই অর্থনীতি সারা দেশের উন্নয়নের জন্য দরকার, যেখানে উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানকে সমানভাবে গুরুত্ব হবে। বেসরকারি খাতকে গুরুত্ব দিয়ে সরকার কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করে চলছে। কেননা সরকারের একার পক্ষে কর্মসংস্থান অর্জন করা সম্ভব নয়। সবার জন্য কর্মসংস্থানের বিষয়টি মাথায় রেখে সক্ষমতাকে বিচেনায় আনতে হবে। এতে সুন্দর একটি সমাজ তৈরি করা সহজ হবে এবং দেশ আরও সামনের দিকে এগিয়ে যাবে, পরিচিত হবে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা হিসেবে।

 

(কলাম লেখক হীরেন পন্ডিতের লেখা এ কলামটি আজ ০২ ফেব্রুয়ারি দৈনিক সময়ের আলো ও সময়ের আলো অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত। এখনই সময়ের পাঠকদের জন্য কিঞ্চিৎ সংক্ষেপিত আকারে প্রকাশিত হলো।)