ঢাকা ১১:১৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৩ মার্চ ২০২৪, ২০ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

মিয়ানমারে গৃহদাহের বহুমাত্রিক রেশ বাংলাদেশে

মিয়ানমারে গৃহদাহের বহুমাত্রিক রেশ বাংলাদেশে

ড. আমেনা মহসিন

 

প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর অনলাইন সংস্করণে ৫ ফেব্রুয়ারি বলা হয়েছে, বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) সঙ্গে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও দেশটির সীমান্তরক্ষী বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) লড়াই চলছে। সীমান্তের ওপারের তীব্র এ লড়াইয়ের রেশ এসে পড়ছে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায়ও। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম-তুমব্রু সীমান্তে গতকাল রাতেও মর্টার শেল ও গুলির শব্দ শোনা গেছে, তা চলে ভোর ৫টা পর্যন্ত। তীব্র গোলাগুলির শব্দে ভয় আর আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কেটেছে সীমান্তবাসীর। একই দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর অনলাইন সংস্করণে আরও বলা হয়, ৫ ফেব্রুয়ারি সকালে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম জানান, মিয়ানমারে চলমান যুদ্ধের জেরে এখন পর্যন্ত বিজিপির ৯৫ জন সদস্য অস্ত্রসহ বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তুমব্রু সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। তিনি আরও জানান, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তাদের নিরস্ত্রীকরণ করে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়েছে। এ ব্যাপারে পরবর্তী কার্যক্রম চলমান।

প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির দায় দীর্ঘদিন ধরে বহন করছি আমরা। ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার এ দেশে অবস্থান এরই নজির। পাশাপাশি মিয়ানমারে দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ সংঘাত-সহিংসতা জিইয়ে রয়েছে এবং তা এখন প্রকট রূপ নিয়েছে। দেশটিতে সশস্ত্র বিদ্রোহীদের প্রচণ্ড বিরোধিতা ও সংঘাত-সংঘর্ষের কারণে জান্তা সরকারের আয়ু ক্রমেই ক্ষয়ে আসছেÑএমন অভিমতও উঠে এসেছে দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমে। মিয়ানমারের সৃষ্ট পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে ওই বক্তব্যও অনেকের। শুধু তাই নয়, রোহিঙ্গা-অধ্যুষিত রাখাইনের বুচিডং ও ফুমালি এলাকায় উভয় পক্ষের লড়াইয়ের প্রভাব আমাদের সীমান্তবর্তী এলাকায়ও পরিলক্ষিত হচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে আমাদের জন্য তা বাড়তি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিয়ানমারের জান্তা সরকার ও সশস্ত্র বিদ্রোহীদের সংঘাত-সংঘর্ষ তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। কিন্তু কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় যখন প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সীমান্তবর্তী এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে তখন কিছু ‘স্পিলওভার ইফেক্ট’ থাকে। তাদের অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপট সীমান্তবর্তী দেশগুলোয়ও ‘স্পিলওভার ইফেক্ট’ সৃষ্টি করছে।

জান্তা সরকার ও বিরোধী সশস্ত্র বিদ্রোহীদের সংঘাত-সংঘর্ষের আঁচ সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ পাচ্ছে, এই বার্তা দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। মিয়ানমার থেকে আসা গুলি ও মর্টার শেল এসে পড়ছে বাংলাদেশে। গুলিতে কয়েকজন বাংলাদেশি হতাহত হয়েছেন। উড়ে আসা গোলার আঘাতে পুড়ে গেছে কয়েকটি বাড়ি। বিশেষত ওই সীমান্ত জঙ্গলাকীর্ণ হওয়ায় বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে সীমানা অতিক্রম করছে এমন অভিযোগও রয়েছে। স্মরণে আছে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একসময় বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠী যখন সক্রিয় ছিল তখন নানা সময়ে বিদ্রোহীরা বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশ করে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। তখন কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে নিরাপত্তা বিষয়ে আলোচনা করে। একইভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন যখন সক্রিয় ছিল তখন নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ভারতে আত্মগোপন করে। দুটি দেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় কোনো একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট পৌঁছে গেলে এভাবেই স্পিলওভার ইফেক্টের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে যা জননিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের জন্যও মিয়ানমারের গৃহদাহ এভাবেই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্পিলওভার ইফেক্ট তৈরি হলে তা আর অভ্যন্তরীণ সংকট থাকে না।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে টানাপড়েন আমাদের রয়েছে এবং তা নিষ্পত্তির গতি ক্ষীণ। আমরা দেখছি, বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের দাবি জানানো সত্ত্বেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে তারা কোনো ভূমিকা রাখছে না। অথচ এমতাবস্থায় অভিন্ন মিত্ররা সংকট নিরসনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারত। ভূরাজনীতির নানা সমীকরণের হিসাব কষতে গিয়ে আন্তর্জাতিক মহল এ ক্ষেত্রে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। অবশ্য ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট একটি বা গুটিকয় উপাদান দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করা ঠিক হবে না। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রসঙ্গটি ইতোমধ্যে জটিল আকার ধারণ করেছে এবং অন্যদিকে বিদ্যমান প্রেক্ষাপটে ভূরাজনৈতিক সংকটের পেছনে অনেক কারণ রয়ে গেছে। এখন যে পরিস্থিতির উদ্ভব মিয়ানমারে হয়েছে তা আমাদের জন্য বাড়তি উপসর্গ।

আমরা জানি, মিয়ানমারে চীনের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। পাশাপাশি মিয়ানমারে দেশটির ব্যাপক বিনিয়োগও রয়েছে। চীনের জাতিগত স্বার্থের ভিত্তিতে তাদের মিয়ানমারের সঙ্গে ভূরাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হচ্ছে। শুধু চীনই নয়, মিয়ানমারে জাপান ও সিঙ্গাপুরেরও বিনিয়োগ রয়েছে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার বিষয়টি তারা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। এসব বিষয় আমাদের কূটনৈতিক চ্যানেলকে আরও গভীরভাবে আমলে নিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অধিকতর জোরদারভাবে উপস্থাপন করতে হবে। কারণ মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা যেন নিশ্চিত হয় এজন্য এসব দেশ তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে পারে। তা ছাড়া মিয়ানমার আসিয়ানভুক্ত দেশ। এ কারণে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ আসতে পারে। আমাদের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের বিষয়গুলো সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। মিয়ানমারের সঙ্গে থাইল্যান্ডেরও সীমান্ত রয়েছে। সেখানেও অনুপ্রবেশ ঘটছে। যদিও থাইল্যান্ড এ বিষয়ে সরব নয় এবং বরাবরই নিরপেক্ষ অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু আমাদের জন্য রোহিঙ্গারা জাতীয় সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে টেকনাফ-উখিয়ার সীমান্তজুড়ে বাংলাদেশিরা চরম আতঙ্কে কাটাচ্ছেন এবং মিয়ানমারে চলমান সংঘর্ষের গোলাবারুদ ওই এলাকায় পড়ছে তা আগেই বলেছি। জান্তা সরকার বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠীর কাছে ইতোমধ্যে ৭৫ শতাংশ সীমান্তবর্তী এলাকা হারিয়ে ফেলেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নিরাপত্তা সংকট আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সৃষ্ট নতুন পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনসহ মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তায় অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিকভাবে কী করণীয়? এ ধরনের সংকট মোকাবিলায় সামরিক ও কূটনৈতিক পথ অনুসরণ করা যেতে পারে। তবে আমাদের কূটনৈতিকভাবে সমাধানের ব্যাপারে বেশি জোর দিতে হবে। মিয়ানমার সংকটের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিরপেক্ষ অবস্থানে রয়েছে। বরং বাংলাদেশ এ ব্যাপারে মানবিক দায়িত্ব পালন করছে। যেহেতু আমরা কোনো পক্ষ অবলম্বন করছি না তাই বিদেশি কূটনৈতিক মহলকে অতীত-বর্তমান ধরে নতুন কর্মকৌশল নিতে হবে।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত ও চীনের সুসম্পর্ক রয়েছে। এ দুটি দেশের সঙ্গেই মিয়ানমারেরও নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। চীনের সঙ্গে আমাদের আরও সম্পর্কোন্নয়ন করতে হবে। বিশেষত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে ‘স্ট্যান্ডালোন’ ইস্যু হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। সচরাচর দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় অন্যান্য প্রসঙ্গের সঙ্গে রোহিঙ্গা ইস্যুও জোর দিয়ে উপস্থাপন করা হয়। তবে আমি মনে করি, এ বিষয়টিকে স্বতন্ত্রভাবে উপস্থাপন করা জরুরি। পাশাপাশি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে সভা-সেমিনার এবং আলোচনা ধারাবাহিকভাবে চালাতে হবে। রোহিঙ্গারা নতুনভাবে তাদের প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে অবস্থান নেওয়ার সংবাদ ৩ ফেব্রুয়ারি প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ উঠে এসেছে। স্বদেশে ফেরার আকুতি জানিয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা ২ ফেব্রুয়ারি উখিয়ার লম্বাশ্বিয়া ক্যাম্পে সমাবেশ করেছে। তারা স্পষ্ট বলেছে, ‘অনেক হয়েছে আর নয়। এবার ফিরতে চাই।’ দীর্ঘদিন শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গারাও স্বভূমে ফিরতে চায় এবং এটা তাদের অত্যন্ত সঙ্গত দাবি। এ বিষয়টিকে এখন নতুনভাবে ভিত্তি করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন স্ট্যান্ডালোনভাবে উপস্থাপন করতে হবে।

সীমান্তবর্তী এলাকায় টহল ও নজরদারি বাড়াতে হবে। মিয়ানমার থেকে আর কেউ যেন বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে না পারে এ ব্যাপারে আরও সতর্ক এবং কঠোর অবস্থান নেওয়া বাঞ্ছনীয়। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি এবং এর পাশাপাশি ক্যাম্পে অবস্থানরত বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠীদের শনাক্তকরণ ও তাদের শেকড় উৎপাটনের ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। আমরা দেখছি, টেকনাফ-উখিয়ার ক্যাম্পগুলোয় খুনখারাবির ঘটনা ক্রমাগত ঘটছে এবং মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীর শেকড়বাকড়ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জনপদে রয়েছে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ, বাংলাদেশে অবস্থিত রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অপতৎপরতার খবর, টেকনাফ-উখিয়া অঞ্চলে মিয়ানমারের বিদ্রোহীদের আস্তানার সন্ধান এবং তাদের আস্তানা থেকে আগ্নেয়াস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধারসহ আরসার কয়েক সদস্য আটকÑএসব ঘটনা সর্বসাম্প্রতিক এবং উদ্বেগজনক বার্তা। এ ক্ষেত্রে কূটনৈতিক কর্মকৌশলে আরও জোর দেওয়া জরুরি মনে করি। সমাধান খুঁজতে হবে কূটনৈতিক কর্মকৌশলের মাধ্যমেই। মিয়ানমারে বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ সংকটে জান্তা সরকার সামরিক কায়দায় সমস্যার সমাধান করতে চাচ্ছে। কিন্তু তাদের উচিত ছিল রাজনৈতিক পন্থায় সমাধান খুঁজে বের করা।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও ত্বরিৎ করতে হবে এবং নিরাপত্তাজনিত বিষয়গুলো নিয়ে আসিয়ান কিংবা অন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে এগুতে হবে। মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি যে বাড়তি উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে ও সংকট আরও বহুমাত্রিক হয়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি করেছে এই প্রেক্ষাপটে কূটনৈতিক দূরদর্শীতার প্রতিফলন জরুরি।

 

(কূটনীতি-বিশ্লেষক, অধ্যাপক, ড. আমেনা মহসিন এর লেখা এ কলামটি আজ ০৬ ফেব্রিয়ারি দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকাতে প্রকাশিত। এখনই সময় এর পাঠকের জন্য কিঞ্চিৎ সংক্ষেপিত আকারে প্রকাশ করা হলো।)

মন্তব্য লিখুন

মিয়ানমারে গৃহদাহের বহুমাত্রিক রেশ বাংলাদেশে

আপডেটের সময় ০৭:০৬:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

ড. আমেনা মহসিন

 

প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর অনলাইন সংস্করণে ৫ ফেব্রুয়ারি বলা হয়েছে, বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) সঙ্গে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও দেশটির সীমান্তরক্ষী বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) লড়াই চলছে। সীমান্তের ওপারের তীব্র এ লড়াইয়ের রেশ এসে পড়ছে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায়ও। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম-তুমব্রু সীমান্তে গতকাল রাতেও মর্টার শেল ও গুলির শব্দ শোনা গেছে, তা চলে ভোর ৫টা পর্যন্ত। তীব্র গোলাগুলির শব্দে ভয় আর আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কেটেছে সীমান্তবাসীর। একই দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর অনলাইন সংস্করণে আরও বলা হয়, ৫ ফেব্রুয়ারি সকালে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম জানান, মিয়ানমারে চলমান যুদ্ধের জেরে এখন পর্যন্ত বিজিপির ৯৫ জন সদস্য অস্ত্রসহ বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তুমব্রু সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। তিনি আরও জানান, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তাদের নিরস্ত্রীকরণ করে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়েছে। এ ব্যাপারে পরবর্তী কার্যক্রম চলমান।

প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির দায় দীর্ঘদিন ধরে বহন করছি আমরা। ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার এ দেশে অবস্থান এরই নজির। পাশাপাশি মিয়ানমারে দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ সংঘাত-সহিংসতা জিইয়ে রয়েছে এবং তা এখন প্রকট রূপ নিয়েছে। দেশটিতে সশস্ত্র বিদ্রোহীদের প্রচণ্ড বিরোধিতা ও সংঘাত-সংঘর্ষের কারণে জান্তা সরকারের আয়ু ক্রমেই ক্ষয়ে আসছেÑএমন অভিমতও উঠে এসেছে দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমে। মিয়ানমারের সৃষ্ট পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে ওই বক্তব্যও অনেকের। শুধু তাই নয়, রোহিঙ্গা-অধ্যুষিত রাখাইনের বুচিডং ও ফুমালি এলাকায় উভয় পক্ষের লড়াইয়ের প্রভাব আমাদের সীমান্তবর্তী এলাকায়ও পরিলক্ষিত হচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে আমাদের জন্য তা বাড়তি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিয়ানমারের জান্তা সরকার ও সশস্ত্র বিদ্রোহীদের সংঘাত-সংঘর্ষ তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। কিন্তু কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় যখন প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সীমান্তবর্তী এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে তখন কিছু ‘স্পিলওভার ইফেক্ট’ থাকে। তাদের অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপট সীমান্তবর্তী দেশগুলোয়ও ‘স্পিলওভার ইফেক্ট’ সৃষ্টি করছে।

জান্তা সরকার ও বিরোধী সশস্ত্র বিদ্রোহীদের সংঘাত-সংঘর্ষের আঁচ সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ পাচ্ছে, এই বার্তা দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। মিয়ানমার থেকে আসা গুলি ও মর্টার শেল এসে পড়ছে বাংলাদেশে। গুলিতে কয়েকজন বাংলাদেশি হতাহত হয়েছেন। উড়ে আসা গোলার আঘাতে পুড়ে গেছে কয়েকটি বাড়ি। বিশেষত ওই সীমান্ত জঙ্গলাকীর্ণ হওয়ায় বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে সীমানা অতিক্রম করছে এমন অভিযোগও রয়েছে। স্মরণে আছে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একসময় বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠী যখন সক্রিয় ছিল তখন নানা সময়ে বিদ্রোহীরা বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশ করে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। তখন কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে নিরাপত্তা বিষয়ে আলোচনা করে। একইভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন যখন সক্রিয় ছিল তখন নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ভারতে আত্মগোপন করে। দুটি দেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় কোনো একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট পৌঁছে গেলে এভাবেই স্পিলওভার ইফেক্টের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে যা জননিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের জন্যও মিয়ানমারের গৃহদাহ এভাবেই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্পিলওভার ইফেক্ট তৈরি হলে তা আর অভ্যন্তরীণ সংকট থাকে না।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে টানাপড়েন আমাদের রয়েছে এবং তা নিষ্পত্তির গতি ক্ষীণ। আমরা দেখছি, বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের দাবি জানানো সত্ত্বেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে তারা কোনো ভূমিকা রাখছে না। অথচ এমতাবস্থায় অভিন্ন মিত্ররা সংকট নিরসনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারত। ভূরাজনীতির নানা সমীকরণের হিসাব কষতে গিয়ে আন্তর্জাতিক মহল এ ক্ষেত্রে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। অবশ্য ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট একটি বা গুটিকয় উপাদান দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করা ঠিক হবে না। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রসঙ্গটি ইতোমধ্যে জটিল আকার ধারণ করেছে এবং অন্যদিকে বিদ্যমান প্রেক্ষাপটে ভূরাজনৈতিক সংকটের পেছনে অনেক কারণ রয়ে গেছে। এখন যে পরিস্থিতির উদ্ভব মিয়ানমারে হয়েছে তা আমাদের জন্য বাড়তি উপসর্গ।

আমরা জানি, মিয়ানমারে চীনের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। পাশাপাশি মিয়ানমারে দেশটির ব্যাপক বিনিয়োগও রয়েছে। চীনের জাতিগত স্বার্থের ভিত্তিতে তাদের মিয়ানমারের সঙ্গে ভূরাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হচ্ছে। শুধু চীনই নয়, মিয়ানমারে জাপান ও সিঙ্গাপুরেরও বিনিয়োগ রয়েছে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার বিষয়টি তারা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। এসব বিষয় আমাদের কূটনৈতিক চ্যানেলকে আরও গভীরভাবে আমলে নিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অধিকতর জোরদারভাবে উপস্থাপন করতে হবে। কারণ মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা যেন নিশ্চিত হয় এজন্য এসব দেশ তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে পারে। তা ছাড়া মিয়ানমার আসিয়ানভুক্ত দেশ। এ কারণে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ আসতে পারে। আমাদের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের বিষয়গুলো সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। মিয়ানমারের সঙ্গে থাইল্যান্ডেরও সীমান্ত রয়েছে। সেখানেও অনুপ্রবেশ ঘটছে। যদিও থাইল্যান্ড এ বিষয়ে সরব নয় এবং বরাবরই নিরপেক্ষ অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু আমাদের জন্য রোহিঙ্গারা জাতীয় সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে টেকনাফ-উখিয়ার সীমান্তজুড়ে বাংলাদেশিরা চরম আতঙ্কে কাটাচ্ছেন এবং মিয়ানমারে চলমান সংঘর্ষের গোলাবারুদ ওই এলাকায় পড়ছে তা আগেই বলেছি। জান্তা সরকার বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠীর কাছে ইতোমধ্যে ৭৫ শতাংশ সীমান্তবর্তী এলাকা হারিয়ে ফেলেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নিরাপত্তা সংকট আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সৃষ্ট নতুন পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনসহ মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তায় অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিকভাবে কী করণীয়? এ ধরনের সংকট মোকাবিলায় সামরিক ও কূটনৈতিক পথ অনুসরণ করা যেতে পারে। তবে আমাদের কূটনৈতিকভাবে সমাধানের ব্যাপারে বেশি জোর দিতে হবে। মিয়ানমার সংকটের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিরপেক্ষ অবস্থানে রয়েছে। বরং বাংলাদেশ এ ব্যাপারে মানবিক দায়িত্ব পালন করছে। যেহেতু আমরা কোনো পক্ষ অবলম্বন করছি না তাই বিদেশি কূটনৈতিক মহলকে অতীত-বর্তমান ধরে নতুন কর্মকৌশল নিতে হবে।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত ও চীনের সুসম্পর্ক রয়েছে। এ দুটি দেশের সঙ্গেই মিয়ানমারেরও নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। চীনের সঙ্গে আমাদের আরও সম্পর্কোন্নয়ন করতে হবে। বিশেষত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে ‘স্ট্যান্ডালোন’ ইস্যু হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। সচরাচর দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় অন্যান্য প্রসঙ্গের সঙ্গে রোহিঙ্গা ইস্যুও জোর দিয়ে উপস্থাপন করা হয়। তবে আমি মনে করি, এ বিষয়টিকে স্বতন্ত্রভাবে উপস্থাপন করা জরুরি। পাশাপাশি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে সভা-সেমিনার এবং আলোচনা ধারাবাহিকভাবে চালাতে হবে। রোহিঙ্গারা নতুনভাবে তাদের প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে অবস্থান নেওয়ার সংবাদ ৩ ফেব্রুয়ারি প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ উঠে এসেছে। স্বদেশে ফেরার আকুতি জানিয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা ২ ফেব্রুয়ারি উখিয়ার লম্বাশ্বিয়া ক্যাম্পে সমাবেশ করেছে। তারা স্পষ্ট বলেছে, ‘অনেক হয়েছে আর নয়। এবার ফিরতে চাই।’ দীর্ঘদিন শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গারাও স্বভূমে ফিরতে চায় এবং এটা তাদের অত্যন্ত সঙ্গত দাবি। এ বিষয়টিকে এখন নতুনভাবে ভিত্তি করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন স্ট্যান্ডালোনভাবে উপস্থাপন করতে হবে।

সীমান্তবর্তী এলাকায় টহল ও নজরদারি বাড়াতে হবে। মিয়ানমার থেকে আর কেউ যেন বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে না পারে এ ব্যাপারে আরও সতর্ক এবং কঠোর অবস্থান নেওয়া বাঞ্ছনীয়। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি এবং এর পাশাপাশি ক্যাম্পে অবস্থানরত বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠীদের শনাক্তকরণ ও তাদের শেকড় উৎপাটনের ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। আমরা দেখছি, টেকনাফ-উখিয়ার ক্যাম্পগুলোয় খুনখারাবির ঘটনা ক্রমাগত ঘটছে এবং মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীর শেকড়বাকড়ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জনপদে রয়েছে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ, বাংলাদেশে অবস্থিত রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অপতৎপরতার খবর, টেকনাফ-উখিয়া অঞ্চলে মিয়ানমারের বিদ্রোহীদের আস্তানার সন্ধান এবং তাদের আস্তানা থেকে আগ্নেয়াস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধারসহ আরসার কয়েক সদস্য আটকÑএসব ঘটনা সর্বসাম্প্রতিক এবং উদ্বেগজনক বার্তা। এ ক্ষেত্রে কূটনৈতিক কর্মকৌশলে আরও জোর দেওয়া জরুরি মনে করি। সমাধান খুঁজতে হবে কূটনৈতিক কর্মকৌশলের মাধ্যমেই। মিয়ানমারে বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ সংকটে জান্তা সরকার সামরিক কায়দায় সমস্যার সমাধান করতে চাচ্ছে। কিন্তু তাদের উচিত ছিল রাজনৈতিক পন্থায় সমাধান খুঁজে বের করা।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও ত্বরিৎ করতে হবে এবং নিরাপত্তাজনিত বিষয়গুলো নিয়ে আসিয়ান কিংবা অন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে এগুতে হবে। মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি যে বাড়তি উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে ও সংকট আরও বহুমাত্রিক হয়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি করেছে এই প্রেক্ষাপটে কূটনৈতিক দূরদর্শীতার প্রতিফলন জরুরি।

 

(কূটনীতি-বিশ্লেষক, অধ্যাপক, ড. আমেনা মহসিন এর লেখা এ কলামটি আজ ০৬ ফেব্রিয়ারি দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকাতে প্রকাশিত। এখনই সময় এর পাঠকের জন্য কিঞ্চিৎ সংক্ষেপিত আকারে প্রকাশ করা হলো।)