ঢাকা ১১:৩৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৩ মার্চ ২০২৪, ২০ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সম্ভাবনার নতুন বাংলাদেশের হাতছানি

বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সম্ভাবনার নতুন বাংলাদেশের হাতছানি

ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়ার নিবন্ধ

 

গত ১৫ বছরে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যত সফলতা অর্জিত হয়েছে তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আর কোনো সরকারের অধীনে হয়নি। সফলতা অর্জনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে এ দেশের গণতন্ত্রমনা জনগণ গত ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিয়ে টানা চতুর্থবারের মতো আওয়ামী লীগকে নির্বাচিত করেছে। নির্বাচনের পরদিনই চীন, রাশিয়া, ভারতসহ অনেক দেশ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানায়।

পশ্চিমা দেশগুলোকে শুরুতে ভিন্ন অবস্থানে দেখা গেলেও পরবর্তীতে তারা বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থা বিশ্লেষণে ইতোমধ্যেই নতুন সরকারকে উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়েছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় নিঃসন্দেহে বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সম্ভাবনার নতুন বাংলাদেশের হাতছানি।

উল্লেখ্য, বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে অর্থনৈতিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত বাংলাদেশ থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের পর এবার ২০৪১ রূপকল্পে তরুণদের জন্য স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার যে ভিশন নিয়ে সরকার এগিয়ে চলেছে, তার অন্যতম একটি স্তম্ভ হিসেবে স্মার্ট ইকোনমিকে গ্রহণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যেই বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি সরকার গ্রহণ করেছে। নতুন সরকারের যাত্রায় স্মার্ট ইকোনমি যথাযথভাবে এগিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক মহলের শুভদৃষ্টি এবং ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তোলার যে ঘোষণা আসতে শুরু করেছে, তা অসাধারণ। স্মার্ট বাংলাদেশের স্মার্ট ইকোনমিতে আন্তর্জাতিক মহলের শুভদৃষ্টি মূলত বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে তাদের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ।

প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার একটানা চতুর্থবার এবং সব মিলিয়ে পঞ্চমবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার বিষয়টি সারাবিশ্বে চমক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। বিশ্বের প্রত্যেকটা স্বাধীন দেশ প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সুদক্ষ নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অবলোকন করেছে। তার নেতৃত্বে অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের যে উন্নয়ন হয়েছে তা চোখে পড়ার মতো।

অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল বাংলাদেশে ইতিমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিনিয়োগ এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন করে বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাথে বিদেশি দেশগুলোর একটা কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হতে যাচ্ছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। একটি বিষয় সুস্পষ্টভাবে সামনে আসতে শুরু করেছে যে, বাংলাদেশের বিষয়ে বিশ্বের অন্য দেশগুলো খুবই আগ্রহী। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের বিভিন্ন কথা ও আলোচনার বিষয়বস্তু থেকে পরিষ্কারভাবে ধারণা করা যায় যে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও বেশি সম্প্রসারিত হবে।

গত ডিসেম্বরের শেষে লন্ডনভিত্তিক সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চের (সিইবিআর) পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, অব্যাহত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে ২০৩৮ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের ২০তম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হবে। সিইবিআর এর পূর্বাভাসে ওঠে এসেছে যে, বাংলাদেশের বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ২০২৩-২৪ এবং ২০২৭-২৮ সালের মধ্যে গড়ে ৬ দশমিক ৮ শতাংশে উন্নীত হবে। আগামী ১৫ বছরে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক লিগ টেবিলের (ডব্লিউইএলটি) র‌্যাঙ্কিয়ে দ্রুত এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

সিইবিআরের পূর্বাভাস, বাংলাদেশ ২০৩৮ সালের মধ্যে অর্থনৈতিক সূচকের টেবিলে ১৭ ধাপ ওপরে উঠে আসবে। বর্তমান অবস্থান ৩৭তম। ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ তিন ধাপ এগিয়ে যাবে এবং ২০৩৩ সালের মধ্যে ২৩তম স্থানে উঠে আসবে। উক্ত পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামীতে বাংলাদেশের অর্থনীতির অগ্রগতি সম্পর্কে যে অনুমান করা হয়েছে তাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি ওই দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের জোড়ালো সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশের শিল্পোদ্যোক্তাদের মতো বৈশ্বিক শিল্পোদ্যোক্তারাও তাদের সঞ্চিত অর্থ কোথাও না কোথাও বিনিয়োগ করতে চান। সে ক্ষেত্রে তারা বিনিয়োগের নিরাপত্তা, ব্যবসায়ের পরিবেশ, মুনাফা নিজ দেশে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাসহ আরও অনেক বিষয় বিবেচনা করেন। এসব দিক থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের চোখে বাংলাদেশ এখন অনেক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। ব্যালান্স অব পেমেন্টেও বাংলাদেশের অবস্থান এখন অনেক ভালো। বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার ক্রমেই সম্প্রসারিত হচ্ছে। মানুষের মাথাপিছু আয় অনেক বেড়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারও অনেক সমৃদ্ধ হয়েছে। এসব কারণে বাংলাদেশ এখন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। এখন প্রয়োজন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা যেখানে সরকার হাত দেওয়া শুরু করেছে ইতোমধ্যে। ব্যবসায় সহজীকরণ করার লক্ষ্যে নানা রকম উদ্যোগ নেওয়া, প্রয়োজন দুর্নীতি কমানো এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন। বর্তমান সরকার সে কাজগুলোও দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। গোলটেবিল বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বার্ষিক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ আরও বাড়ানোর ক্ষেত্রে ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল অনুঘটকের ভূমিকা পালন করবে।

দেশের ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নের পাশাপাশি বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারের নানা পদক্ষেপ ইতোমধ্যে কাজে দিচ্ছে। ফলে গত অর্থবছরের এপ্রিল-জুন তিন মাসে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে ৩৪০২১৮.৬৩৯ মিলিয়ন বা ৩৪ হাজার ২১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে।

বিডায় নিবন্ধিত শিল্পের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপ্রিল থেকে জুন- এই তিন মাসে বিডায় ২৫৯টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত হয়েছে। তার মধ্যে ২২৮টি শিল্প ইউনিট স্থানীয়, ২০টি শতভাগ বিদেশি এবং ১১টিতে যৌথ বিনিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে। প্রস্তাবিত এ বিনিয়োগের মধ্যে ২,৮৫,৬৪২.৪৪১ মিলিয়ন টাকা স্থানীয় এবং ৫৪,৫৭৬.১৯৮ মিলিয়ন টাকা বিদেশি বিনিয়োগ হয়েছে। বিগত এপ্রিল-জুন-২০২২ সময়ে বিনিয়োগের মোট প্রস্তাব ছিল ২,৪৮,২১৫.৯৪৯ মিলিয়ন টাকা। সে অনুযায়ী এ বছর মোট বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৭.০৬ শতাংশ।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নির্বাচন নিয়ে গত বছরের মাঝামাঝি সময় থেকেই বেশ সরব দেখা যাচ্ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নকে। সেই দেশগুলো এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ যখন সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছে, তখন সাধারণ মানুষও সম্ভাবনার আলো দেখতে শুরু করেছে। সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের তাগিদ দিয়ে আসছিল তারা। তদানুসারে গত ৭ জানুয়ারি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠনের এক সপ্তাহের ভেতর জাতিসংঘসহ বিশ্বের প্রভাবশালী অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ বেশিরভাগ দেশ নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকারকে অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছে। পাশাপাশি আগামী দিনগুলোতে কীভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা যায়, সেদিকেও ইঙ্গিত দিয়েছে। যার ফলে আগামীর বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কূটনৈতিক সম্ভাবনার বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দক্ষ হাতে সকল দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তকে পরাজিত করে বাংলাদেশকে একটি বিনিয়োগ এবং কূটনৈতিক সম্ভাবনার দেশে পরিণত করেন।

১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে বিজয়ের পর বাংলাদেশের শাসনভার নিজের কাঁধে নিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শান্তি ও পররাষ্ট্রনীতির যে অনুসরণ করেছিলেন, তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনাও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করে এগিয়ে চলেছেন সামনে। ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’- বিশ্বশান্তির পক্ষে বঙ্গবন্ধুর এ অমোঘ নীতিই এখনো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র। এ মূলমন্ত্রের ওপর ভর করেই সব বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে দেশ উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন দেশের সর্বকালের সফল প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা। তার শাসনামলের প্রতিটি পদে রচিত হচ্ছে সফলতার ইতিহাস। তার দূরদর্শী কূটনৈতিক নেতৃত্বের কারণে শেখ হাসিনা সরকারের বিগত ১৫ বছরে অজস্র কূটনৈতিক সাফল্য অর্জিত হয়েছে। শেখ হাসিনা হয়ে উঠেছেন দেশ ও বিশ্বপরিমণ্ডলে গণতন্ত্র, উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও শান্তির প্রতীক। তারই নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ বিশ্বসভায় শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। একসময়ের ক্ষুদ্র অর্থনীতির দেশটি আজ আবির্ভূত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ হিসেবে।

সুতরাং আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সুদক্ষ নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন সকল দিক দিয়ে পৃথিবীর বুকে একটি অপার সম্ভাবনার দেশে পরিণত হয়েছে। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সম্ভাবনার নতুন এক দেশ। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট ইকোনমি সমৃদ্ধ স্মার্ট বাংলাদেশ নির্মাণ করে পৃথিবীর বুকে একটি বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সম্ভাবনার নতুন বাংলাদেশে পরিণত করার লক্ষ্যে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের দিক দিয়ে বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলে প্রত্যাশা করছি।

(লেখক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া: উপাচার্য, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। নিবন্ধটি দৈনিক কালবেলায় প্রকাশিত। এখনই সময়ের পাঠকের জন্য কিঞ্চিৎ সংক্ষেপিত আকারে প্রকাশ করা হলো।)

মন্তব্য লিখুন

বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সম্ভাবনার নতুন বাংলাদেশের হাতছানি

আপডেটের সময় ১১:২৮:২০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়ার নিবন্ধ

 

গত ১৫ বছরে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যত সফলতা অর্জিত হয়েছে তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আর কোনো সরকারের অধীনে হয়নি। সফলতা অর্জনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে এ দেশের গণতন্ত্রমনা জনগণ গত ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিয়ে টানা চতুর্থবারের মতো আওয়ামী লীগকে নির্বাচিত করেছে। নির্বাচনের পরদিনই চীন, রাশিয়া, ভারতসহ অনেক দেশ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানায়।

পশ্চিমা দেশগুলোকে শুরুতে ভিন্ন অবস্থানে দেখা গেলেও পরবর্তীতে তারা বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থা বিশ্লেষণে ইতোমধ্যেই নতুন সরকারকে উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়েছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় নিঃসন্দেহে বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সম্ভাবনার নতুন বাংলাদেশের হাতছানি।

উল্লেখ্য, বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে অর্থনৈতিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত বাংলাদেশ থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের পর এবার ২০৪১ রূপকল্পে তরুণদের জন্য স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার যে ভিশন নিয়ে সরকার এগিয়ে চলেছে, তার অন্যতম একটি স্তম্ভ হিসেবে স্মার্ট ইকোনমিকে গ্রহণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যেই বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি সরকার গ্রহণ করেছে। নতুন সরকারের যাত্রায় স্মার্ট ইকোনমি যথাযথভাবে এগিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক মহলের শুভদৃষ্টি এবং ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তোলার যে ঘোষণা আসতে শুরু করেছে, তা অসাধারণ। স্মার্ট বাংলাদেশের স্মার্ট ইকোনমিতে আন্তর্জাতিক মহলের শুভদৃষ্টি মূলত বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে তাদের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ।

প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার একটানা চতুর্থবার এবং সব মিলিয়ে পঞ্চমবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার বিষয়টি সারাবিশ্বে চমক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। বিশ্বের প্রত্যেকটা স্বাধীন দেশ প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সুদক্ষ নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অবলোকন করেছে। তার নেতৃত্বে অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের যে উন্নয়ন হয়েছে তা চোখে পড়ার মতো।

অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল বাংলাদেশে ইতিমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিনিয়োগ এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন করে বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাথে বিদেশি দেশগুলোর একটা কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হতে যাচ্ছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। একটি বিষয় সুস্পষ্টভাবে সামনে আসতে শুরু করেছে যে, বাংলাদেশের বিষয়ে বিশ্বের অন্য দেশগুলো খুবই আগ্রহী। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের বিভিন্ন কথা ও আলোচনার বিষয়বস্তু থেকে পরিষ্কারভাবে ধারণা করা যায় যে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও বেশি সম্প্রসারিত হবে।

গত ডিসেম্বরের শেষে লন্ডনভিত্তিক সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চের (সিইবিআর) পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, অব্যাহত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে ২০৩৮ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের ২০তম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হবে। সিইবিআর এর পূর্বাভাসে ওঠে এসেছে যে, বাংলাদেশের বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ২০২৩-২৪ এবং ২০২৭-২৮ সালের মধ্যে গড়ে ৬ দশমিক ৮ শতাংশে উন্নীত হবে। আগামী ১৫ বছরে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক লিগ টেবিলের (ডব্লিউইএলটি) র‌্যাঙ্কিয়ে দ্রুত এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

সিইবিআরের পূর্বাভাস, বাংলাদেশ ২০৩৮ সালের মধ্যে অর্থনৈতিক সূচকের টেবিলে ১৭ ধাপ ওপরে উঠে আসবে। বর্তমান অবস্থান ৩৭তম। ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ তিন ধাপ এগিয়ে যাবে এবং ২০৩৩ সালের মধ্যে ২৩তম স্থানে উঠে আসবে। উক্ত পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামীতে বাংলাদেশের অর্থনীতির অগ্রগতি সম্পর্কে যে অনুমান করা হয়েছে তাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি ওই দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের জোড়ালো সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশের শিল্পোদ্যোক্তাদের মতো বৈশ্বিক শিল্পোদ্যোক্তারাও তাদের সঞ্চিত অর্থ কোথাও না কোথাও বিনিয়োগ করতে চান। সে ক্ষেত্রে তারা বিনিয়োগের নিরাপত্তা, ব্যবসায়ের পরিবেশ, মুনাফা নিজ দেশে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাসহ আরও অনেক বিষয় বিবেচনা করেন। এসব দিক থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের চোখে বাংলাদেশ এখন অনেক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। ব্যালান্স অব পেমেন্টেও বাংলাদেশের অবস্থান এখন অনেক ভালো। বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার ক্রমেই সম্প্রসারিত হচ্ছে। মানুষের মাথাপিছু আয় অনেক বেড়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারও অনেক সমৃদ্ধ হয়েছে। এসব কারণে বাংলাদেশ এখন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। এখন প্রয়োজন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা যেখানে সরকার হাত দেওয়া শুরু করেছে ইতোমধ্যে। ব্যবসায় সহজীকরণ করার লক্ষ্যে নানা রকম উদ্যোগ নেওয়া, প্রয়োজন দুর্নীতি কমানো এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন। বর্তমান সরকার সে কাজগুলোও দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। গোলটেবিল বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বার্ষিক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ আরও বাড়ানোর ক্ষেত্রে ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল অনুঘটকের ভূমিকা পালন করবে।

দেশের ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নের পাশাপাশি বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারের নানা পদক্ষেপ ইতোমধ্যে কাজে দিচ্ছে। ফলে গত অর্থবছরের এপ্রিল-জুন তিন মাসে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে ৩৪০২১৮.৬৩৯ মিলিয়ন বা ৩৪ হাজার ২১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে।

বিডায় নিবন্ধিত শিল্পের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপ্রিল থেকে জুন- এই তিন মাসে বিডায় ২৫৯টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত হয়েছে। তার মধ্যে ২২৮টি শিল্প ইউনিট স্থানীয়, ২০টি শতভাগ বিদেশি এবং ১১টিতে যৌথ বিনিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে। প্রস্তাবিত এ বিনিয়োগের মধ্যে ২,৮৫,৬৪২.৪৪১ মিলিয়ন টাকা স্থানীয় এবং ৫৪,৫৭৬.১৯৮ মিলিয়ন টাকা বিদেশি বিনিয়োগ হয়েছে। বিগত এপ্রিল-জুন-২০২২ সময়ে বিনিয়োগের মোট প্রস্তাব ছিল ২,৪৮,২১৫.৯৪৯ মিলিয়ন টাকা। সে অনুযায়ী এ বছর মোট বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৭.০৬ শতাংশ।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নির্বাচন নিয়ে গত বছরের মাঝামাঝি সময় থেকেই বেশ সরব দেখা যাচ্ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নকে। সেই দেশগুলো এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ যখন সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছে, তখন সাধারণ মানুষও সম্ভাবনার আলো দেখতে শুরু করেছে। সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের তাগিদ দিয়ে আসছিল তারা। তদানুসারে গত ৭ জানুয়ারি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠনের এক সপ্তাহের ভেতর জাতিসংঘসহ বিশ্বের প্রভাবশালী অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ বেশিরভাগ দেশ নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকারকে অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছে। পাশাপাশি আগামী দিনগুলোতে কীভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা যায়, সেদিকেও ইঙ্গিত দিয়েছে। যার ফলে আগামীর বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কূটনৈতিক সম্ভাবনার বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দক্ষ হাতে সকল দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তকে পরাজিত করে বাংলাদেশকে একটি বিনিয়োগ এবং কূটনৈতিক সম্ভাবনার দেশে পরিণত করেন।

১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে বিজয়ের পর বাংলাদেশের শাসনভার নিজের কাঁধে নিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শান্তি ও পররাষ্ট্রনীতির যে অনুসরণ করেছিলেন, তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনাও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করে এগিয়ে চলেছেন সামনে। ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’- বিশ্বশান্তির পক্ষে বঙ্গবন্ধুর এ অমোঘ নীতিই এখনো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র। এ মূলমন্ত্রের ওপর ভর করেই সব বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে দেশ উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন দেশের সর্বকালের সফল প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা। তার শাসনামলের প্রতিটি পদে রচিত হচ্ছে সফলতার ইতিহাস। তার দূরদর্শী কূটনৈতিক নেতৃত্বের কারণে শেখ হাসিনা সরকারের বিগত ১৫ বছরে অজস্র কূটনৈতিক সাফল্য অর্জিত হয়েছে। শেখ হাসিনা হয়ে উঠেছেন দেশ ও বিশ্বপরিমণ্ডলে গণতন্ত্র, উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও শান্তির প্রতীক। তারই নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ বিশ্বসভায় শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। একসময়ের ক্ষুদ্র অর্থনীতির দেশটি আজ আবির্ভূত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ হিসেবে।

সুতরাং আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সুদক্ষ নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন সকল দিক দিয়ে পৃথিবীর বুকে একটি অপার সম্ভাবনার দেশে পরিণত হয়েছে। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সম্ভাবনার নতুন এক দেশ। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট ইকোনমি সমৃদ্ধ স্মার্ট বাংলাদেশ নির্মাণ করে পৃথিবীর বুকে একটি বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সম্ভাবনার নতুন বাংলাদেশে পরিণত করার লক্ষ্যে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের দিক দিয়ে বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলে প্রত্যাশা করছি।

(লেখক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া: উপাচার্য, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। নিবন্ধটি দৈনিক কালবেলায় প্রকাশিত। এখনই সময়ের পাঠকের জন্য কিঞ্চিৎ সংক্ষেপিত আকারে প্রকাশ করা হলো।)