ঢাকা ১২:২৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৩ মার্চ ২০২৪, ২০ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারের করণীয়

চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারের করণীয়

ড. মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানা চতুর্থ মেয়াদে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করেছেন। সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাঁর পক্ষে রয়েছে। ১২তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে প্রতিহত এবং বিতর্কিত করার জন্য বিরোধীপক্ষ মাঠে-ময়দানে কৌশলে যা করতে চেয়েছিল, তা ব্যর্থ হয়েছে। শেখ হাসিনা আবারও প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন যে তিনি রাজনীতিতে যতটা পারদর্শিতা অর্জন করেছেন, তার ধারেকাছেও বিরোধীরা কিংবা দলেও তেমন কেউ নেই।

আন্তর্জাতিকভাবেও কোনো কোনো বড় শক্তি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার যেসব উদ্যোগ নিয়েছিল, সেগুলোও তিনি দক্ষতার সঙ্গে মোকাবেলা করেছেন। সংসদ নির্বাচনে তিনি প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সুযোগ রেখে যে নজির স্থাপন করেছেন, তা বিরোধীদের ধারণাকে ব্যর্থ করে দিয়েছে। সংসদে এখন কার্যকর বিরোধী দল তেমন বড় না হলেও স্বতন্ত্র ৬২ জনকে সরকারের কর্মকাণ্ড এবং সংসদে স্বাধীনভাবে ভূমিকা রাখার যে সুযোগ দিয়েছেন, তাতে সংসদ প্রাণবন্ত ও কার্যকর হবে—এমন প্রত্যাশা করাই যায়।

সংসদ অধিবেশন শুরু হয়েছে ৩০ জানুয়ারি। একে একে সব বাধা অতিক্রম করে শেখ হাসিনা সরকার গঠন এবং কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নতুন যাত্রা শুরু করেছেন। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের বহু আগে থেকেই একের পর এক বাধা এবং জটিল পরিস্থিতি তাঁর সম্মুখে তৈরি হতে থাকে। তিনি রাজনীতির সৃজনশীলতা দিয়ে সব কিছুই অতিক্রম করেছেন। এবারের মন্ত্রিসভা গঠনেও তিনি দক্ষতার পরিচয় দেখাতে পেরেছেন।

শেখ হাসিনা রাজনীতিতে প্রবেশের পর থেকেই তাঁর পেছন ছাড়েনি শত্রুপক্ষের বুলেট, একইভাবে স্বাধীনতাবিরোধী এবং নানা সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র। এবারও সেই ষড়যন্ত্র দেশে-বিদেশে কম ঘটেনি। তিনি কোনোটা কৌশলে, কোনোটা অনড় নীতিগত অবস্থানের দৃঢ়তায় প্রতিহত করেছেন। সামনের দিনগুলোতেও তাঁকে এসব মোকাবেলা করেই দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি, বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত সুখী, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার যাত্রা অব্যাহত রাখতে হবে। তাঁর রেখে আসা নিকট অতীত সবারই জানা।

বদলে দিয়েছেন তিনি বাংলাদেশকে। সে কারণে ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের নজরকাড়া দেশ। তার পরও বলতে হবে আমাদের জাতীয় জীবনে এখনো চ্যালেঞ্জের অন্ত নেই। সুখের বিষয় হলো, চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে নির্বাচনের আগে যে ইশতেহার জাতির সম্মুখে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দিয়েছেন, তাতে স্পষ্ট বোঝা যায় তিনি দেশের সমস্যা লুকাতে চাননি, বরং এই মেয়াদে সেসব চ্যালেঞ্জকে তিনি মোকাবেলা করতে প্রস্তুত।

গত তিন মেয়াদে সরকার দেশে যেসব অবকাঠামো, অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিদ্যুতায়ন, শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগ, যাতায়াত, খাদ্য উৎপাদন, কৃষি সম্প্রসারণ, দারিদ্র্য দূরীকরণ, মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান, গ্রাম ও শহরের ব্যবধান কমিয়ে আনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে যে অভাবনীয় পরিবর্তন সাধন করেছেন, তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তবে করোনা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট বাংলাদেশেও অভিঘাত সৃষ্টি করেছে। এর ফলে উন্নয়নশীল এবং বিশেষভাবে আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি টালমাটাল অবস্থার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারের করণীয়মধ্য দিয়ে অতিক্রান্ত হচ্ছে। সে কারণেই ইশতেহারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধের বিষয়টিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে দ্রব্যমূল্য সবার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। নির্বাচনে জয়লাভ করার পর থেকে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীবর্গ, আওয়ামী লীগ বিষয়টিকে বারবার জনগণের সম্মুখে তুলে ধরছে। সংসদ অধিবেশনের আগ থেকেই আওয়ামী লীগ এবং স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধের বিষয়টিকে তাঁদের সবার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে বলার চেষ্টা করছেন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির জন্য বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট, আমদানি ও ডলার সংকট এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি যেমন অনুঘটক, একইভাবে দেশের অভ্যন্তরে বাজারব্যবস্থায় অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, মজুদদারি এবং অতি লোভ ও অতি মুনাফার প্রবণতা যুক্ত হয়েছে। করোনার শেষ পর্যায় থেকেই বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি লাগামহীনভাবে বেড়ে উঠতে শুরু করে। সেটি এখনো পাগলা ঘোড়ার মতো দৌড়াচ্ছে। ক্রেতাসাধারণ দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারছে না। কিছু বাস্তব কারণও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। কয়েক মাস আগে বৃষ্টি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং শৈত্যপ্রবাহের কারণে রবিশস্যসহ শাক-সবজি, আলু, পেঁয়াজ ইত্যাদি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে বাজারে খাদ্যদ্রব্য, মাছ, মাংস, শাক-সবজির মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। সরকার বিষয়গুলো সম্পর্কে অবহিত হলেও দ্রুত বাজার নিয়ন্ত্রণে আনার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। কিন্তু তার পরও সরকারকে সমন্বিত ও পরিকল্পিতভাবে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী চাহিদামতো সরবরাহ এবং ক্রেতাসাধারণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার উপায় উদ্ভাবন করতেই হবে। এ ক্ষেত্রে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা থাকতে হবে। তাহলে ধীরে ধীরে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সহনীয় পর্যায়ে আনা সম্ভব হতে পারে। প্রতিবেশী ভারত থেকে বেশ কিছু পণ্য আমদানি করে হলেও ভোগ্য পণ্যের মূল্য ক্রমহ্রাসমান করার ব্যবস্থার বিষয়টি ভেবে দেখা যেতে পারে।

দেশে উন্নয়ন-অগ্রগতির পাশাপাশি দুর্নীতি সর্বস্তরে বিস্তার করেছে। ইশতেহারে তাই বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সমাজে অনিয়ম, দুর্নীতি বেড়ে গেলে তার প্রভাব দ্রব্যমূল্যসহ অনেক ক্ষেত্রেই পড়ে। চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যুতা, করফাঁকি, সরকারি সম্পদ লুটপাট, কাজ না করা, প্রভাব বিস্তার করা, অপচয় এবং রাষ্ট্রের সম্পদ লুটপাট করার মানসিকতা ক্রমেই বাড়ছে। দেশে যথেষ্ট আইন থাকার পরও আইনের প্রয়োগ ঠিকমতো হচ্ছে না। অর্থের বিনিময়ে সব কিছু গ্রাস করার প্রবণতাও রয়েছে। ঘুষ, দুর্নীতি, চোরাকারবারি, রাতারাতি বিপুল অর্থের মালিক হওয়া, ব্যাংক লুটপাট করাসহ অর্থসংশ্লিষ্ট সব স্থানেই অনিয়ম বৃদ্ধি পাচ্ছে। হেন কোনো পেশা নেই, যেখানে দুর্নীতি নেই। শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেও দুর্নীতি স্থান করে নিয়েছে। ফলে সমাজের সচেতনমহলের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেকেই সে কারণে বিদেশে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করছে। রাজনীতিতেও এখন আদর্শের চর্চা প্রায় অনুপস্থিত হয়ে পড়েছে। দলের পদ-পদবি লাভেও দুর্নীতি জড়িত রয়েছে। এই পরিস্থিতির লাগাম এখনই যদি টেনে না ধরা হয়, তাহলে গোটা সমাজ ও রাষ্ট্রের সব অর্জন ম্লান হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য যে ধরনের জ্ঞানচর্চা থাকা প্রয়োজন, তা মোটেও অর্জিত হবে না যদি শিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে সততার প্রয়োগ না থাকে। প্রশাসন, বিভিন্ন পেশা এবং রাজনীতিতে মেধা ও দক্ষতাকে প্রাধান্য দিতেই হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে দালালি এবং তদবিরবাজি রাষ্ট্র, রাজনীতি, প্রশাসনসহ সর্বস্তরে সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে। এর ফলে সর্বত্র অনিয়ম, দুর্নীতি রাষ্ট্রের উন্নতি ও অগ্রগতিকে মানহীনতার দিকে টেনে নামিয়ে ফেলছে। এসবকে আর চলতে দেওয়া উচিত হবে না। দলের মধ্যে আদর্শ, শিক্ষাদীক্ষা, মেধা ও দক্ষতার স্থান যেন প্রশ্নাতীত হয়। বর্তমানে দেশের রাজনীতিতে আদর্শের চর্চা নেই বললেই চলে। আমাদের রাষ্ট্রের ইতিহাস, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বিশ্বব্যবস্থার যে জটিল পরিস্থিতি, সে সম্পর্কে নেতাকর্মীদের মধ্যে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা আবশ্যকীয়। কিন্তু সেখানে এখন ব্যাপক শূন্যতা বিরাজ করছে। সে কারণে আওয়ামী লীগকে এই মেয়াদে আদর্শিকভাবে সুসংগঠিত হতে হবে। আগামী দিনের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে রাজনীতির পাঠশালা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তাহলে দলের নেতৃত্ব বর্তমান দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সফল হতে পারবে। এই ব্যবস্থাটি শেখ হাসিনার এই পাঁচ বছরের মেয়াদে কার্যকর হবে—এমনটি রাজনীতিসচেতন মানুষ আশা করে।

দেশ থেকে দুর্নীতি, অনিয়ম ইত্যাদি দূর করতে হলে একদিকে যেমন আদর্শের রাজনীতি, অন্যদিকে শিক্ষাদীক্ষায় তরুণদের দক্ষ ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এখনো সনদের ছড়াছড়ি। কিন্তু মানের ঘাটতি প্রকট আকার ধারণ করছে। এসব মিলিয়ে দেশের বৃহত্তর তরুণসমাজের মধ্যে বেকারত্বের যে অবস্থাটি বিরাজ করছে, তা নিরসন করা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার অভ্যন্তরে নানা বিভক্তি, ধারা, উপধারা বিরাজ করছে। এর বড় অংশই শ্রমবাজারের কোনো চাহিদা পূরণ করার যোগ্য নয়। সুতরাং বিষয়গুলোকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে এবং কিভাবে প্রতিটি শিশু-কিশোরকে দেশের সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা যায়, সেই ব্যবস্থাটি কার্যকর করতে হবে।

ইশতেহারে ১১টি সমস্যাকে অগ্রাধিকার বিবেচনায় সমাধান করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনা যেভাবে রাজনীতিতে একের পর এক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছেন, অনেক অসাধ্য সাধন করে মানুষকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন, মানুষের মধ্যে শেষ ভরসা হিসেবে তাঁর অবস্থানের বিষয়টিকে অনেকেই এখন বিশ্বাসও করছে। তাই রাজনীতিতে এই মেয়াদে তিনি ইতিহাসে স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে ওঠার মতো কিছু কাজ করে যাবেন—মানুষের এমন প্রত্যাশাও ব্যাপকভাবে প্রচারিত হচ্ছে। তিনি নিজেও হয়তো মানসিকভাবে বর্তমান মেয়াদে সরকার পরিচালনাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিয়েছেন। তাঁর এই চ্যালেঞ্জ নেওয়ার মধ্য দিয়ে দেশে প্রত্যাশিত পরিবর্তন সাধিত হলে দিনবদলের ধারাবাহিক ইতিহাস সৃষ্টি হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

 

(অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারীর এ লেখাটি  ০৩ ফেব্রুয়ারি কালের কন্ঠ পত্রিকা ও কন্ঠ পত্রিকা অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত। এখনই সময়ের পাঠকদের জন্য কিঞ্চিৎ সংক্ষেপিত আকারে প্রকাশিত হলো।)

মন্তব্য লিখুন

চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারের করণীয়

আপডেটের সময় ১১:২৯:১৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

ড. মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানা চতুর্থ মেয়াদে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করেছেন। সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাঁর পক্ষে রয়েছে। ১২তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে প্রতিহত এবং বিতর্কিত করার জন্য বিরোধীপক্ষ মাঠে-ময়দানে কৌশলে যা করতে চেয়েছিল, তা ব্যর্থ হয়েছে। শেখ হাসিনা আবারও প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন যে তিনি রাজনীতিতে যতটা পারদর্শিতা অর্জন করেছেন, তার ধারেকাছেও বিরোধীরা কিংবা দলেও তেমন কেউ নেই।

আন্তর্জাতিকভাবেও কোনো কোনো বড় শক্তি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার যেসব উদ্যোগ নিয়েছিল, সেগুলোও তিনি দক্ষতার সঙ্গে মোকাবেলা করেছেন। সংসদ নির্বাচনে তিনি প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সুযোগ রেখে যে নজির স্থাপন করেছেন, তা বিরোধীদের ধারণাকে ব্যর্থ করে দিয়েছে। সংসদে এখন কার্যকর বিরোধী দল তেমন বড় না হলেও স্বতন্ত্র ৬২ জনকে সরকারের কর্মকাণ্ড এবং সংসদে স্বাধীনভাবে ভূমিকা রাখার যে সুযোগ দিয়েছেন, তাতে সংসদ প্রাণবন্ত ও কার্যকর হবে—এমন প্রত্যাশা করাই যায়।

সংসদ অধিবেশন শুরু হয়েছে ৩০ জানুয়ারি। একে একে সব বাধা অতিক্রম করে শেখ হাসিনা সরকার গঠন এবং কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নতুন যাত্রা শুরু করেছেন। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের বহু আগে থেকেই একের পর এক বাধা এবং জটিল পরিস্থিতি তাঁর সম্মুখে তৈরি হতে থাকে। তিনি রাজনীতির সৃজনশীলতা দিয়ে সব কিছুই অতিক্রম করেছেন। এবারের মন্ত্রিসভা গঠনেও তিনি দক্ষতার পরিচয় দেখাতে পেরেছেন।

শেখ হাসিনা রাজনীতিতে প্রবেশের পর থেকেই তাঁর পেছন ছাড়েনি শত্রুপক্ষের বুলেট, একইভাবে স্বাধীনতাবিরোধী এবং নানা সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র। এবারও সেই ষড়যন্ত্র দেশে-বিদেশে কম ঘটেনি। তিনি কোনোটা কৌশলে, কোনোটা অনড় নীতিগত অবস্থানের দৃঢ়তায় প্রতিহত করেছেন। সামনের দিনগুলোতেও তাঁকে এসব মোকাবেলা করেই দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি, বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত সুখী, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার যাত্রা অব্যাহত রাখতে হবে। তাঁর রেখে আসা নিকট অতীত সবারই জানা।

বদলে দিয়েছেন তিনি বাংলাদেশকে। সে কারণে ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের নজরকাড়া দেশ। তার পরও বলতে হবে আমাদের জাতীয় জীবনে এখনো চ্যালেঞ্জের অন্ত নেই। সুখের বিষয় হলো, চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে নির্বাচনের আগে যে ইশতেহার জাতির সম্মুখে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দিয়েছেন, তাতে স্পষ্ট বোঝা যায় তিনি দেশের সমস্যা লুকাতে চাননি, বরং এই মেয়াদে সেসব চ্যালেঞ্জকে তিনি মোকাবেলা করতে প্রস্তুত।

গত তিন মেয়াদে সরকার দেশে যেসব অবকাঠামো, অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিদ্যুতায়ন, শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগ, যাতায়াত, খাদ্য উৎপাদন, কৃষি সম্প্রসারণ, দারিদ্র্য দূরীকরণ, মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান, গ্রাম ও শহরের ব্যবধান কমিয়ে আনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে যে অভাবনীয় পরিবর্তন সাধন করেছেন, তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তবে করোনা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট বাংলাদেশেও অভিঘাত সৃষ্টি করেছে। এর ফলে উন্নয়নশীল এবং বিশেষভাবে আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি টালমাটাল অবস্থার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারের করণীয়মধ্য দিয়ে অতিক্রান্ত হচ্ছে। সে কারণেই ইশতেহারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধের বিষয়টিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে দ্রব্যমূল্য সবার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। নির্বাচনে জয়লাভ করার পর থেকে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীবর্গ, আওয়ামী লীগ বিষয়টিকে বারবার জনগণের সম্মুখে তুলে ধরছে। সংসদ অধিবেশনের আগ থেকেই আওয়ামী লীগ এবং স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধের বিষয়টিকে তাঁদের সবার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে বলার চেষ্টা করছেন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির জন্য বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট, আমদানি ও ডলার সংকট এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি যেমন অনুঘটক, একইভাবে দেশের অভ্যন্তরে বাজারব্যবস্থায় অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, মজুদদারি এবং অতি লোভ ও অতি মুনাফার প্রবণতা যুক্ত হয়েছে। করোনার শেষ পর্যায় থেকেই বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি লাগামহীনভাবে বেড়ে উঠতে শুরু করে। সেটি এখনো পাগলা ঘোড়ার মতো দৌড়াচ্ছে। ক্রেতাসাধারণ দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারছে না। কিছু বাস্তব কারণও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। কয়েক মাস আগে বৃষ্টি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং শৈত্যপ্রবাহের কারণে রবিশস্যসহ শাক-সবজি, আলু, পেঁয়াজ ইত্যাদি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে বাজারে খাদ্যদ্রব্য, মাছ, মাংস, শাক-সবজির মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। সরকার বিষয়গুলো সম্পর্কে অবহিত হলেও দ্রুত বাজার নিয়ন্ত্রণে আনার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। কিন্তু তার পরও সরকারকে সমন্বিত ও পরিকল্পিতভাবে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী চাহিদামতো সরবরাহ এবং ক্রেতাসাধারণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার উপায় উদ্ভাবন করতেই হবে। এ ক্ষেত্রে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা থাকতে হবে। তাহলে ধীরে ধীরে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সহনীয় পর্যায়ে আনা সম্ভব হতে পারে। প্রতিবেশী ভারত থেকে বেশ কিছু পণ্য আমদানি করে হলেও ভোগ্য পণ্যের মূল্য ক্রমহ্রাসমান করার ব্যবস্থার বিষয়টি ভেবে দেখা যেতে পারে।

দেশে উন্নয়ন-অগ্রগতির পাশাপাশি দুর্নীতি সর্বস্তরে বিস্তার করেছে। ইশতেহারে তাই বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সমাজে অনিয়ম, দুর্নীতি বেড়ে গেলে তার প্রভাব দ্রব্যমূল্যসহ অনেক ক্ষেত্রেই পড়ে। চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যুতা, করফাঁকি, সরকারি সম্পদ লুটপাট, কাজ না করা, প্রভাব বিস্তার করা, অপচয় এবং রাষ্ট্রের সম্পদ লুটপাট করার মানসিকতা ক্রমেই বাড়ছে। দেশে যথেষ্ট আইন থাকার পরও আইনের প্রয়োগ ঠিকমতো হচ্ছে না। অর্থের বিনিময়ে সব কিছু গ্রাস করার প্রবণতাও রয়েছে। ঘুষ, দুর্নীতি, চোরাকারবারি, রাতারাতি বিপুল অর্থের মালিক হওয়া, ব্যাংক লুটপাট করাসহ অর্থসংশ্লিষ্ট সব স্থানেই অনিয়ম বৃদ্ধি পাচ্ছে। হেন কোনো পেশা নেই, যেখানে দুর্নীতি নেই। শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেও দুর্নীতি স্থান করে নিয়েছে। ফলে সমাজের সচেতনমহলের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেকেই সে কারণে বিদেশে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করছে। রাজনীতিতেও এখন আদর্শের চর্চা প্রায় অনুপস্থিত হয়ে পড়েছে। দলের পদ-পদবি লাভেও দুর্নীতি জড়িত রয়েছে। এই পরিস্থিতির লাগাম এখনই যদি টেনে না ধরা হয়, তাহলে গোটা সমাজ ও রাষ্ট্রের সব অর্জন ম্লান হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য যে ধরনের জ্ঞানচর্চা থাকা প্রয়োজন, তা মোটেও অর্জিত হবে না যদি শিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে সততার প্রয়োগ না থাকে। প্রশাসন, বিভিন্ন পেশা এবং রাজনীতিতে মেধা ও দক্ষতাকে প্রাধান্য দিতেই হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে দালালি এবং তদবিরবাজি রাষ্ট্র, রাজনীতি, প্রশাসনসহ সর্বস্তরে সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে। এর ফলে সর্বত্র অনিয়ম, দুর্নীতি রাষ্ট্রের উন্নতি ও অগ্রগতিকে মানহীনতার দিকে টেনে নামিয়ে ফেলছে। এসবকে আর চলতে দেওয়া উচিত হবে না। দলের মধ্যে আদর্শ, শিক্ষাদীক্ষা, মেধা ও দক্ষতার স্থান যেন প্রশ্নাতীত হয়। বর্তমানে দেশের রাজনীতিতে আদর্শের চর্চা নেই বললেই চলে। আমাদের রাষ্ট্রের ইতিহাস, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বিশ্বব্যবস্থার যে জটিল পরিস্থিতি, সে সম্পর্কে নেতাকর্মীদের মধ্যে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা আবশ্যকীয়। কিন্তু সেখানে এখন ব্যাপক শূন্যতা বিরাজ করছে। সে কারণে আওয়ামী লীগকে এই মেয়াদে আদর্শিকভাবে সুসংগঠিত হতে হবে। আগামী দিনের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে রাজনীতির পাঠশালা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তাহলে দলের নেতৃত্ব বর্তমান দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সফল হতে পারবে। এই ব্যবস্থাটি শেখ হাসিনার এই পাঁচ বছরের মেয়াদে কার্যকর হবে—এমনটি রাজনীতিসচেতন মানুষ আশা করে।

দেশ থেকে দুর্নীতি, অনিয়ম ইত্যাদি দূর করতে হলে একদিকে যেমন আদর্শের রাজনীতি, অন্যদিকে শিক্ষাদীক্ষায় তরুণদের দক্ষ ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এখনো সনদের ছড়াছড়ি। কিন্তু মানের ঘাটতি প্রকট আকার ধারণ করছে। এসব মিলিয়ে দেশের বৃহত্তর তরুণসমাজের মধ্যে বেকারত্বের যে অবস্থাটি বিরাজ করছে, তা নিরসন করা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার অভ্যন্তরে নানা বিভক্তি, ধারা, উপধারা বিরাজ করছে। এর বড় অংশই শ্রমবাজারের কোনো চাহিদা পূরণ করার যোগ্য নয়। সুতরাং বিষয়গুলোকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে এবং কিভাবে প্রতিটি শিশু-কিশোরকে দেশের সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা যায়, সেই ব্যবস্থাটি কার্যকর করতে হবে।

ইশতেহারে ১১টি সমস্যাকে অগ্রাধিকার বিবেচনায় সমাধান করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনা যেভাবে রাজনীতিতে একের পর এক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছেন, অনেক অসাধ্য সাধন করে মানুষকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন, মানুষের মধ্যে শেষ ভরসা হিসেবে তাঁর অবস্থানের বিষয়টিকে অনেকেই এখন বিশ্বাসও করছে। তাই রাজনীতিতে এই মেয়াদে তিনি ইতিহাসে স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে ওঠার মতো কিছু কাজ করে যাবেন—মানুষের এমন প্রত্যাশাও ব্যাপকভাবে প্রচারিত হচ্ছে। তিনি নিজেও হয়তো মানসিকভাবে বর্তমান মেয়াদে সরকার পরিচালনাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিয়েছেন। তাঁর এই চ্যালেঞ্জ নেওয়ার মধ্য দিয়ে দেশে প্রত্যাশিত পরিবর্তন সাধিত হলে দিনবদলের ধারাবাহিক ইতিহাস সৃষ্টি হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

 

(অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারীর এ লেখাটি  ০৩ ফেব্রুয়ারি কালের কন্ঠ পত্রিকা ও কন্ঠ পত্রিকা অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত। এখনই সময়ের পাঠকদের জন্য কিঞ্চিৎ সংক্ষেপিত আকারে প্রকাশিত হলো।)