ঢাকা ১২:১৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৩ মার্চ ২০২৪, ২০ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

ভারতের প্রতিবেশী প্রথম পররাষ্ট্রনীতির হালচাল

ভারতের প্রতিবেশী প্রথম পররাষ্ট্রনীতির হালচাল

জয়ন্ত ঘোষাল

 

দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। শ্রীলঙ্কার পর এবার মিয়ানমার, মালদ্বীপ, নেপাল, এমনকি ভুটানেও চীন আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে এগোচ্ছে। ড্রাগনের তপ্ত নিঃশ্বাস সর্বত্র। ঢাকায়ও তো চেষ্টার ত্রুটি নেই।

এটা কি তবে ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির ব্যর্থতা?

কয়েক দিন আগে ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাই শহরে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের এক আলোচনা অনুষ্ঠানে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর বলেছেন, প্রতিবেশী প্রথম নীতি ব্যর্থ নয়। তাঁর ভাষায়, অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীন নিজেদের প্রভাব বলয় বাড়াতে চাইবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিযোগিতায় থাকার সক্ষমতা ভারতেরও রয়েছে। জয়শঙ্কর বলেছেন, “আমি মনে করি না চীনের বিষয়ে আমাদের ভয় পাওয়া উচিত।

আমি মনে করি, আমাদের বলা উচিত—‘ঠিক আছে, বৈশ্বিক রাজনীতি প্রতিযোগিতামূলক খেলা, তুমি তোমার সর্বোচ্চটা দাও, আমিও আমার সর্বোচ্চটা দেব।’”

জয়শঙ্করের সাম্প্রতিকতম বই ‘হোয়াই ভারত ম্যাটারস’। এই বইটি নিয়ে আলোচনাই ছিল মুম্বাই সভার উদ্দেশ্য। ছাত্র-ছাত্রীদের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন তিনি।

এই বইটিতে ভারতের নিজস্ব অতীতের সনাতন ধারার সঙ্গে লেখক আজকের বিশ্ব কূটনীতির যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করেছেন। রাম-রামায়ণ, রাবণ ও রামের যুদ্ধের প্রসঙ্গ ২২৫ পৃষ্ঠার বইতে তিনি উত্থাপন করেছেন ২৯ বার। তিনবার মহাভারত প্রসঙ্গ এসেছে। ফরেন সার্ভিসের কর্মকর্তা পররাষ্ট্রমন্ত্রী আজ অনেক বেশি রাজনৈতিক নেতা। তাই তাঁর প্রথম প্রতিবেশী নীতিও শুষ্কং কাষ্ঠং পররাষ্ট্রনীতিই নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মোদির রাজনৈতিক প্রজ্ঞা।

আসলে ভারত স্বল্পমেয়াদি নয়, দীর্ঘমেয়াদি কূটনীতির পথে হাঁটতে চাইছে। ভারত ও চীন দ্বৈরথ নতুন ঘটনা নয়। সুবিদিত। কিন্তু সম্প্রতি এমন খবরও আসছে, চীনের অর্থনীতির প্রবল অবনতি হচ্ছে। লন্ডনের ফিন্যানশিয়াল টাইমসে বিশিষ্ট রাজনীতি-অর্থনীতির অ্যানালিস্ট রুচির যোশী লিখেছেন, “ It is irreversible decline of china’s share of the global GDP.” রুচির বিখ্যাত বিনিয়োগকারী এবং ফান্ড ম্যানেজার। আসলে এক বিপুল জনসংখ্যার দেশ চীন কমিউনিস্ট রাষ্ট্র। কিন্তু কয়েক দশক ধরে প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষায় বিপুল বিনিয়োগ করতে গিয়ে চীন জনকল্যাণমুখী অর্থনীতিকে অবজ্ঞা করছে। এখন অর্থনীতি সংকটে। এর মানে অবশ্য এই নয় যে শিগগিরই ভারতের অর্থনীতি চীনকে অতিক্রম করতে পারবে। কিন্তু চীনের ক্রমিক আর্থিক অবনতি আর ভারতের আর্থিক সক্রিয়তা বাড়ছে। বিশ্বরাজনীতিতে ভারত এই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে চাইছে।

কোনো সন্দেহ নেই, মালদ্বীপ নিয়ে ভারতের উদ্বেগ আছে। কিন্তু শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছে ভারত। জয়শঙ্কর বলেছেন, জ্বালানি ও খাদ্য সংকটের মধ্যে গোটা বিশ্ব যখন শ্রীলঙ্কার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, তখন ভারতই তাদের পাশে দাঁড়ায়। শ্রীলঙ্কা আইএমএফের কাছ থেকে তিন বিলিয়ন ডলারের কম অর্থ সাহায্য পেয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে শ্রীলঙ্কাকে সাড়ে চার বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি দেয় ভারত। নেপালেও ভারতের বিদ্যুৎ রপ্তানি বিরাট লাভজনক।

ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ পররাষ্ট্রনীতির হালচাল চীন এসব প্রতিবেশী দেশে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। এখন একটু পিছিয়ে এলেও বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ তৈরির জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সমর্থন চাইছে। পাকিস্তানের সঙ্গে অর্থিক করিডর তো আছেই। এ অবস্থায় সম্ভবত বাংলাদেশের ওপর ভারতের নির্ভরশীলতা প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। জয়শঙ্কর বলেছেন, সড়ক ও রেল যোগাযোগও এখন বেশ সচল হয়েছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নিজেদের ভেতর দিয়ে যাওয়ার ও বন্দর ব্যবহারের সুযোগ ভারতকে দিয়েছে বাংলাদশ। জয়শঙ্কর বলছেন, ‘আমাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এর বিশাল প্রভাব রয়েছে। তা না হলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে শিলিগুড়ি করিডর ধরে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে পূর্বাঞ্চলের বন্দরে আসতে হতো। বাস্তবতা হচ্ছে, এখন তারা চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করতে পারছে। এভাবে চললে পুরো উত্তর-পূর্বাঞ্চল এলাকার উন্নয়ন হবে।’

চীন যে শেখ হাসিনার বাংলাদেশেও একইভাবে প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে, এটাও সুবিদিত। কিন্তু বাংলাদেশের নেত্রী শেখ হাসিনা মুনশিয়ানার সঙ্গে চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা করলেও কখনোই তাতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে সামান্যতম চিড় ধরতে দেননি। এ শুধু চীন-পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্রের সে সময়কার অক্ষের জন্য নয়, এ হলো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবতাবোধও। যুক্তরাষ্ট্র এবারও ভোটের আগে যেভাবে ঢাকাকে চাপের মধ্যে ফেলে ভোট পিছিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে উদ্যত হয়, তখন ভারত যেভাবে বাংলাদেশের গণতন্ত্র রক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তা-ও অভূতপূর্ব।

এ কথা সত্য, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে এখনো বেশ কিছু বিষয়ে অভিযোগ, দাবি ও টানাপড়েন আছে। এ ব্যাপারেও ভারত আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসার জন্য তৎপর। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ দিল্লি আসছেন ৭ ফেব্রুয়ারি। জয়শঙ্করের আমন্ত্রণে। তিনি বলেছেন, এবার ভারতের সঙ্গে তিস্তা চুক্তি নিয়েও আলোচনা হবে।

ভারত তাই বাংলাদেশের ওপর আজ বিশেষভাবে নির্ভরশীল। জয়শঙ্করের এই পররাষ্ট্রনীতি বুঝতে আজকের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নের ভূমিকাও বোঝা প্রয়োজন। এখন গোটা পৃথিবী স্থিতিশীল বা Sustainable development-এর কথা বলছে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থায় চীন আর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যেমন প্রতিযোগিতা তীব্র, এখন ভারতও এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে। জয়শঙ্করের ভাষায়, চীন তার সম্পদ ব্যবহার করে নিজেদের প্রভাব বাড়াচ্ছে। আর এমনটাই হওয়ার কথা।

এ ব্যাপারে তিনি বলেন, চীনের বিষয়ে অভিযোগ করব না, বরং বলব, ঠিক আছে, তুমি এটা করছ, আমাকে এর চেয়ে ভালোটা করতে দাও।

আর এই বিশ্ব প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আঞ্চলিকতাবাদ নামক ধারণাটা বিশ্বে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিভিন্ন কারণে যখন একটি অঞ্চলের বিভিন্ন রাষ্ট্র একত্র হয়, মিলিত সে প্রয়াস একটি সংস্থা বা মঞ্চ গঠন করে, একেই আঞ্চলিকতাবাদ বলে। এভাবেই একদা ন্যাটো, আসিয়ান, সার্ক, আফ্রিকান ইউনিয়ন তৈরি হয়েছে। আজ যেমন চীনের অক্ষ মোকাবেলায় ভারতের সঙ্গে আছে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন। একে বলা হচ্ছে, বহু মেরুর এশিয়া। এভাবেই আজ ভারতও চাইছে এই প্রতিযোগিতায় উন্নয়নের প্রশ্নে বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো তার পাশে থাকুক।

একেই বলা হয় Regional unity বা আঞ্চলিক সংহতি। এই ধারণাটির মুখ্য প্রবক্তা হলেন ডেভিড মিত্রানি। মিত্রানি বলেছেন, বর্তমান কালে নানা দেশ নানা সমস্যায় আক্রান্ত। সব সমস্যার আশু সমাধান জরুরি। ছাপ্পান্ন সালে ইউরোপিয়ান ইকোনমিক কমিউনিটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

ঠিক এভাবেই আজ গ্লোবাল সাউথে কোন কোন দেশ আছে? জাতিসংঘ বাণিজ্য উন্নয়নের সম্মেলন জানাচ্ছে, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান। এশিয়া থাকলেও এতে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইসরায়েল নেই।

এটাই হলো আঞ্চলিক সমন্বয় ও সহযোগিতার কূটনীতি। এ জন্য চীনের সঙ্গে সংঘাতের পথে না গিয়ে ভারত প্রতিবেশী প্রথম নীতি নিয়েই এগোতে চাইছে। আর এই কূটনীতির সাফল্যের জন্য ভারতের বিশেষভাবে প্রয়োজন বাংলাদেশকে।

(নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র, বিশেষ প্রতিনিধি জয়ন্ত ঘোষাল এর লেখা এ কলামটি আজ ০৫ ফেব্রুয়ারি কালের কন্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত। এখনই সময়ের পাঠকের জন্য কিঞ্চিৎ সংক্ষেপিত আকারে প্রকাশিত হলো।)

মন্তব্য লিখুন

ভারতের প্রতিবেশী প্রথম পররাষ্ট্রনীতির হালচাল

আপডেটের সময় ০৭:৪৫:৩৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

জয়ন্ত ঘোষাল

 

দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। শ্রীলঙ্কার পর এবার মিয়ানমার, মালদ্বীপ, নেপাল, এমনকি ভুটানেও চীন আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে এগোচ্ছে। ড্রাগনের তপ্ত নিঃশ্বাস সর্বত্র। ঢাকায়ও তো চেষ্টার ত্রুটি নেই।

এটা কি তবে ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির ব্যর্থতা?

কয়েক দিন আগে ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাই শহরে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের এক আলোচনা অনুষ্ঠানে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর বলেছেন, প্রতিবেশী প্রথম নীতি ব্যর্থ নয়। তাঁর ভাষায়, অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীন নিজেদের প্রভাব বলয় বাড়াতে চাইবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিযোগিতায় থাকার সক্ষমতা ভারতেরও রয়েছে। জয়শঙ্কর বলেছেন, “আমি মনে করি না চীনের বিষয়ে আমাদের ভয় পাওয়া উচিত।

আমি মনে করি, আমাদের বলা উচিত—‘ঠিক আছে, বৈশ্বিক রাজনীতি প্রতিযোগিতামূলক খেলা, তুমি তোমার সর্বোচ্চটা দাও, আমিও আমার সর্বোচ্চটা দেব।’”

জয়শঙ্করের সাম্প্রতিকতম বই ‘হোয়াই ভারত ম্যাটারস’। এই বইটি নিয়ে আলোচনাই ছিল মুম্বাই সভার উদ্দেশ্য। ছাত্র-ছাত্রীদের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন তিনি।

এই বইটিতে ভারতের নিজস্ব অতীতের সনাতন ধারার সঙ্গে লেখক আজকের বিশ্ব কূটনীতির যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করেছেন। রাম-রামায়ণ, রাবণ ও রামের যুদ্ধের প্রসঙ্গ ২২৫ পৃষ্ঠার বইতে তিনি উত্থাপন করেছেন ২৯ বার। তিনবার মহাভারত প্রসঙ্গ এসেছে। ফরেন সার্ভিসের কর্মকর্তা পররাষ্ট্রমন্ত্রী আজ অনেক বেশি রাজনৈতিক নেতা। তাই তাঁর প্রথম প্রতিবেশী নীতিও শুষ্কং কাষ্ঠং পররাষ্ট্রনীতিই নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মোদির রাজনৈতিক প্রজ্ঞা।

আসলে ভারত স্বল্পমেয়াদি নয়, দীর্ঘমেয়াদি কূটনীতির পথে হাঁটতে চাইছে। ভারত ও চীন দ্বৈরথ নতুন ঘটনা নয়। সুবিদিত। কিন্তু সম্প্রতি এমন খবরও আসছে, চীনের অর্থনীতির প্রবল অবনতি হচ্ছে। লন্ডনের ফিন্যানশিয়াল টাইমসে বিশিষ্ট রাজনীতি-অর্থনীতির অ্যানালিস্ট রুচির যোশী লিখেছেন, “ It is irreversible decline of china’s share of the global GDP.” রুচির বিখ্যাত বিনিয়োগকারী এবং ফান্ড ম্যানেজার। আসলে এক বিপুল জনসংখ্যার দেশ চীন কমিউনিস্ট রাষ্ট্র। কিন্তু কয়েক দশক ধরে প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষায় বিপুল বিনিয়োগ করতে গিয়ে চীন জনকল্যাণমুখী অর্থনীতিকে অবজ্ঞা করছে। এখন অর্থনীতি সংকটে। এর মানে অবশ্য এই নয় যে শিগগিরই ভারতের অর্থনীতি চীনকে অতিক্রম করতে পারবে। কিন্তু চীনের ক্রমিক আর্থিক অবনতি আর ভারতের আর্থিক সক্রিয়তা বাড়ছে। বিশ্বরাজনীতিতে ভারত এই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে চাইছে।

কোনো সন্দেহ নেই, মালদ্বীপ নিয়ে ভারতের উদ্বেগ আছে। কিন্তু শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছে ভারত। জয়শঙ্কর বলেছেন, জ্বালানি ও খাদ্য সংকটের মধ্যে গোটা বিশ্ব যখন শ্রীলঙ্কার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, তখন ভারতই তাদের পাশে দাঁড়ায়। শ্রীলঙ্কা আইএমএফের কাছ থেকে তিন বিলিয়ন ডলারের কম অর্থ সাহায্য পেয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে শ্রীলঙ্কাকে সাড়ে চার বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি দেয় ভারত। নেপালেও ভারতের বিদ্যুৎ রপ্তানি বিরাট লাভজনক।

ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ পররাষ্ট্রনীতির হালচাল চীন এসব প্রতিবেশী দেশে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। এখন একটু পিছিয়ে এলেও বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ তৈরির জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সমর্থন চাইছে। পাকিস্তানের সঙ্গে অর্থিক করিডর তো আছেই। এ অবস্থায় সম্ভবত বাংলাদেশের ওপর ভারতের নির্ভরশীলতা প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। জয়শঙ্কর বলেছেন, সড়ক ও রেল যোগাযোগও এখন বেশ সচল হয়েছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নিজেদের ভেতর দিয়ে যাওয়ার ও বন্দর ব্যবহারের সুযোগ ভারতকে দিয়েছে বাংলাদশ। জয়শঙ্কর বলছেন, ‘আমাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এর বিশাল প্রভাব রয়েছে। তা না হলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে শিলিগুড়ি করিডর ধরে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে পূর্বাঞ্চলের বন্দরে আসতে হতো। বাস্তবতা হচ্ছে, এখন তারা চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করতে পারছে। এভাবে চললে পুরো উত্তর-পূর্বাঞ্চল এলাকার উন্নয়ন হবে।’

চীন যে শেখ হাসিনার বাংলাদেশেও একইভাবে প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে, এটাও সুবিদিত। কিন্তু বাংলাদেশের নেত্রী শেখ হাসিনা মুনশিয়ানার সঙ্গে চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা করলেও কখনোই তাতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে সামান্যতম চিড় ধরতে দেননি। এ শুধু চীন-পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্রের সে সময়কার অক্ষের জন্য নয়, এ হলো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবতাবোধও। যুক্তরাষ্ট্র এবারও ভোটের আগে যেভাবে ঢাকাকে চাপের মধ্যে ফেলে ভোট পিছিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে উদ্যত হয়, তখন ভারত যেভাবে বাংলাদেশের গণতন্ত্র রক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তা-ও অভূতপূর্ব।

এ কথা সত্য, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে এখনো বেশ কিছু বিষয়ে অভিযোগ, দাবি ও টানাপড়েন আছে। এ ব্যাপারেও ভারত আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসার জন্য তৎপর। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ দিল্লি আসছেন ৭ ফেব্রুয়ারি। জয়শঙ্করের আমন্ত্রণে। তিনি বলেছেন, এবার ভারতের সঙ্গে তিস্তা চুক্তি নিয়েও আলোচনা হবে।

ভারত তাই বাংলাদেশের ওপর আজ বিশেষভাবে নির্ভরশীল। জয়শঙ্করের এই পররাষ্ট্রনীতি বুঝতে আজকের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নের ভূমিকাও বোঝা প্রয়োজন। এখন গোটা পৃথিবী স্থিতিশীল বা Sustainable development-এর কথা বলছে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থায় চীন আর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যেমন প্রতিযোগিতা তীব্র, এখন ভারতও এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে। জয়শঙ্করের ভাষায়, চীন তার সম্পদ ব্যবহার করে নিজেদের প্রভাব বাড়াচ্ছে। আর এমনটাই হওয়ার কথা।

এ ব্যাপারে তিনি বলেন, চীনের বিষয়ে অভিযোগ করব না, বরং বলব, ঠিক আছে, তুমি এটা করছ, আমাকে এর চেয়ে ভালোটা করতে দাও।

আর এই বিশ্ব প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আঞ্চলিকতাবাদ নামক ধারণাটা বিশ্বে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিভিন্ন কারণে যখন একটি অঞ্চলের বিভিন্ন রাষ্ট্র একত্র হয়, মিলিত সে প্রয়াস একটি সংস্থা বা মঞ্চ গঠন করে, একেই আঞ্চলিকতাবাদ বলে। এভাবেই একদা ন্যাটো, আসিয়ান, সার্ক, আফ্রিকান ইউনিয়ন তৈরি হয়েছে। আজ যেমন চীনের অক্ষ মোকাবেলায় ভারতের সঙ্গে আছে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন। একে বলা হচ্ছে, বহু মেরুর এশিয়া। এভাবেই আজ ভারতও চাইছে এই প্রতিযোগিতায় উন্নয়নের প্রশ্নে বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো তার পাশে থাকুক।

একেই বলা হয় Regional unity বা আঞ্চলিক সংহতি। এই ধারণাটির মুখ্য প্রবক্তা হলেন ডেভিড মিত্রানি। মিত্রানি বলেছেন, বর্তমান কালে নানা দেশ নানা সমস্যায় আক্রান্ত। সব সমস্যার আশু সমাধান জরুরি। ছাপ্পান্ন সালে ইউরোপিয়ান ইকোনমিক কমিউনিটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

ঠিক এভাবেই আজ গ্লোবাল সাউথে কোন কোন দেশ আছে? জাতিসংঘ বাণিজ্য উন্নয়নের সম্মেলন জানাচ্ছে, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান। এশিয়া থাকলেও এতে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইসরায়েল নেই।

এটাই হলো আঞ্চলিক সমন্বয় ও সহযোগিতার কূটনীতি। এ জন্য চীনের সঙ্গে সংঘাতের পথে না গিয়ে ভারত প্রতিবেশী প্রথম নীতি নিয়েই এগোতে চাইছে। আর এই কূটনীতির সাফল্যের জন্য ভারতের বিশেষভাবে প্রয়োজন বাংলাদেশকে।

(নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র, বিশেষ প্রতিনিধি জয়ন্ত ঘোষাল এর লেখা এ কলামটি আজ ০৫ ফেব্রুয়ারি কালের কন্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত। এখনই সময়ের পাঠকের জন্য কিঞ্চিৎ সংক্ষেপিত আকারে প্রকাশিত হলো।)