চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফকিরহাটে গ্রামীণ সড়কের পাশে থাকা ২১টি গাছ কেটে বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে৷ আর এই পুরো বিষয়টি ঘটেছে স্থানীয় প্রশাসনের নাকের ডগায়৷ গাছ কাটার বিষয়টি জানার পরও সেই গাছ গুলোকে রক্ষায় কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা না নেয়ায় সীতাকুন্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ ফখরুল ইসলামের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে৷
জানা গেছে প্রায় দুই দশক আগে সরকারি অর্থায়নে বিভিন্ন প্রজাতির মূল্যবান বৃক্ষ রোপন করা হয়। স্থানীয় মুরাদপুর ইউনিয়ন পরিষদ এই গাছগুলি রক্ষণাবেক্ষণের দ্বায়িত্বেে ছিল। ২০ বছরে বেড়ে ওঠা গাছ গুলো সড়কে পথচারিদের ছায়া দেয়ার পাশাপাশি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য বর্ধন করছিল৷ কিন্তু ঈদুল আযহা’র বন্ধের সুযোগে মুরাদপুর ইউনিয়ন পরিষদের সড়কের দুই পাশের অন্তত ২১টির মতো বড় আকৃতির মূল্যবান গাছ কেটে বিক্রি করেছে দিয়েছে স্থানীয় একটি মহল। এই গাছ কাটা ও বিক্রির সাথে স্থানীয় ইউনিয়ন যুবদলের এক নেতার সম্পৃক্ত থাকার তথ্য মিলেছে।
এই গাছ গুলো কাটার প্রতিবাদ করায় ৬৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ মোহাম্মদ জুনু মিয়া নামের স্থানীয় এক বাসিন্দা হামলার শিকার হন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। যোগাযোগ করা হলে তিনি গণমাধ্যমকে জানান, স্থানীয় যুবদল নেতারা অবৈধভাবে গাছগুলো কাটছে। তিনি প্রতিবাদ করায় তাঁকে মারধর করা হয়।
আবু তৈয়্যব নামের অপর এক বাসিন্দা গণমাধ্যমকে জানান, যারা গাছ কাটছে এলাকার সবাই তাদের নাম জানে। কিন্তু তাদের নাম বললে মবের শিকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে কেউই নাম বলবে না।
এলাকাবাসী জানান, স্থানীয় একটি চক্র রাস্তা সংস্কারে টেন্ডার পাসের কথা বলে রাস্তার দুই পাশের বিভিন্ন প্রজাতির বড় গাছ কেটে বিক্রি করে দিচ্ছে। ঈদুল আজহার সরকারি ছুটির সময়েই বেশি গাছ কাটা হয়েছে। কেটে নেওয়া বড় গাছগুলোর আনুমানিক বাজার মূল্য ৫ থেকে ৬ লক্ষ টাকা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা এই সকল গাছ কাটা ও বিক্রির সাথে ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সভাপতি মো. কামাল জড়িত বলে জানান৷
এই বিষয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমকে দেয়া বক্তব্যে মুরাদপুর ইউনিয়ন যুবদলের (ভারপ্রাপ্ত) সভাপতি মোহাম্মদ জাফর বলেন, “সরকারিভাবে ঐ রাস্তার টেন্ডার হয়েছে। ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সভাপতি মো. কামালকে সড়ক সংস্কারের কার্যাদেশ পাওয়া ঠিকাদার গাছগুলো কাটার দায়িত্ব দিয়েছেন। তবে ইউএনও ইউনিয়ন পরিষদ সচিবকে ফোন করে গাছ কাটা বন্ধ করতে বলেছেন। ইউপি সচিবের থেকে তিনি বিষয়টি জানার পর কামালকে গাছ কাটা বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।”
মুরাদপুর ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সভাপতি কামালের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এখনই সময়কে বলেন, রাস্তার পাশের সরকারি গাছ কাটার সাথে আমি জড়িত নই। গাছ গুলো রাস্তার কাজের ঠিকাদারই স্থানীয় লোকদের দিয়ে কাটিয়ে ছিল। তবে ইউনিয়ন সচিব গাছ কাটা বন্ধের জন্য বলার পর আর কোনো গাছ কাটা হয়নি৷ কেটে ফেলা সরকারি গাছ গুলো রাতের আঁশারে কে বা কারা নিয়ে গেছে জানতে চাইলে কামাল বলেন, ও গুলো রাতের বেলা নয়, দিনের বেলাতেই যারা কেটেছে তারাই নিয়ে গেছে৷ ঠিকাদার গাছ কাটার দ্বায়িত্ব আপনাকে দিয়েছিলেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, স্পটে ঠিকাদারের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি রাখা আছে৷ এটা (গাছ কাটা) ঠিকাদার নিজেই করিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৬ কোটি ২০ লক্ষ টাকা বরাদ্দে ইউনিয়নের প্রধান রাস্তাটি প্রশস্তকরণ করা হচ্ছে। ঈদের বন্ধের কৌশলে গাছ গুলো কাটার বিষয়টি স্থানীয়রা সীতাকুন্ডের ইউএনওকে জানায়৷ পরে ইউএনও’র নির্দেশে গাছ কাটা সাময়িক বন্ধ করা হলেও কেটে নেওয়া বেশিরভাগ বড় বড় সরকারি গাছগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা। কেটে ফেলা কাছ গুলো হেফাজত করতে না পারার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতাকে দায়ী করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।
ইতিপূর্বে এক গণমাধ্যমকে মুরাদপুর ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বরত প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, সরকারি অনুমোদন ছাড়া গাছ কাটার কোনো সুযোগ নেই। গ্রামীণ সড়কের দু’পাশের গাছ কে বা কারা কাটছে তা তিনি জানেন না। ইউনিয়ন পরিষদের সচিবকে তদন্ত করে গাছ কাটার সঙ্গে জড়িতদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করতে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
তবে এই সংবাদ প্রকাশের পর থেকে গণমাধ্যমকে এক প্রকার এড়িয়ে চলছেন সীতাকুন্ডের ইউএনও৷ স্থানীয় কিছু ঘনিষ্ঠ সংবাদকর্মীর বাহিরে তিনি অন্যান্য সাংবাদিকদের ফোন পর্যন্ত রিসিভ করেন না বলে জানা গেছে৷ এই প্রতিবেদক ইউএনও’র সরকারী নাম্বারে কল দিলেও তিনি সেটি রিসিভ না করে হোয়াটসঅ্যাপে কল বেক করেন৷ এসময় গাছ কাটার বিষয়ে প্রশ্ন শুনেই তিনি সংযোগ কেটে দেন৷ পরে একাধিকবার তাঁকে কল দেয়া হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি৷
মুরাদপুর ইউনিয়নে সরকারী গাছ কাটা ও কেটে ফেলা গাছ নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় কোন প্রকার অভিযোগ সীতাকুন্ড থানায় জানানো হয়নি বলে নিশ্চিত করেছেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহিনুল ইসলাম।


