back to top
শুক্রবার, মার্চ ৬, ২০২৬
Single Page Top Banner

৬ গ্রেডের কর্মকর্তা হয়েও বসে আছেন ৯ম গ্রেডের পদে

বিপিসি’র চেয়ারম্যানের একান্ত সচিবের বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ

আনিসুর রহমান, চট্টগ্রাম।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব ও উপ-ব্যবস্থাপক মো. আহম্মদুল্লাহ। বিপিসিকে যিনি দুর্নীতির এক অভয়ারণ্যে পরিণত করেছেন। তার অবৈধ উপার্জনের মাধ্যমে রাজধানী ঢাকার মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও জমি এবং গ্রামের বাড়িতে নির্মাণ করেছেন বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স ভবন। এছাড়া মিরপুরে দুটি রেস্টুরেন্ট, কোটি কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র, এফডিআর এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার হয়েছেন তিনি। গোপন লকারে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ মজুদসহ স্ত্রী ও স্বজনদের নামে গড়ে তুলেছেন অঢেল সম্পদ।

মো. আহম্মদুল্লাহর বিরুদ্ধে নিয়োগ জালিয়াতি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের চাঞ্চল্যকর অভিযোগও উঠেছে।

জানা গেছে, ২০১৯ সালে বিপিসিতে যোগদানের পর থেকেই সাবেক চেয়ারম্যান মো. সামছুর রহমানের আশীর্বাদে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তিনি। কথিত আছে, সামছুর রহমানের মেয়ের গৃহশিক্ষক হিসেবে ঘনিষ্ঠতা থাকায় বরিশাল অঞ্চলের বাসিন্দা আহম্মদুল্লাহ এই চাকরি বাগিয়ে নেন। তবে অভিযোগ রয়েছে তার এই নিয়োগের মধ্যেই রয়েছে বড় ধরনের জালিয়াতি। ঝালকাঠি সদর উপজেলার দিবাকর কাঠি গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও তিনি ঢাকা জেলার কোটা ব্যবহার করে চাকুরিতে যোগদান করেন। শুধু তাই নয় রাজনৈতিক প্রভাব নিশ্চিত করতে তৎকালীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় কমিটির সক্রিয় সদস্য ও পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয় সংবলিত একটি প্রত্যয়নপত্র জমা দেন। এই রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি বিপিসিতে হয়ে উঠেন একক ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হন।

​সূত্র বলছে, চাকরিতে যোগদানের পর থেকে আহম্মদুল্লাহকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। শ্বশুর ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রয়াত প্রভাবশালী নেতা রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের পিএস। সেই পথে হাটা শুরু করেন তিনিও। মো. আহম্মদুল্লাহ্ বিপিসিতে চেয়ারম্যানের পিএস পদটি বাগিয়ে নিয়ে বসেন। বিপিসি চেয়ারম্যানের একান্ত সহকারীর পদ সহকারী ব্যবস্থাপক (৯ম গ্রেড) সমমানের পদ হলেও বিপিসির প্রবিধানমালা পাত্তা না দিয়ে উপব্যবস্থাপক (৬ষ্ঠ গ্রেড) হয়েও পিএস পদ দখল করে আছেন বছরের পর বছর।

২০২১ সালের ৩ অক্টোবর তৎকালীন চেয়ারম্যান এবিএম আজাদ তাকে দুর্নীতির দায়ে চট্টগ্রামের প্রধান কার্যালয়ে বদলি করলেও অদৃশ্য ক্ষমতার জোরে মাত্র একদিনের মাথায় সেই আদেশ বাতিল করিয়ে স্বপদে ফিরে আসেন তিনি।

দীর্ঘ সময় একই পদে থেকে তিনি বিপিসিকে দুর্নীতির এক অভয়ারণ্যে পরিণত করেছেন। তার অবৈধ উপার্জনের মাধ্যমে রাজধানী ঢাকার মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও জমি এবং গ্রামের বাড়িতে নির্মাণ করেছেন বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স ভবন। এছাড়া মিরপুরে দুটি রেস্টুরেন্ট, কোটি কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র, এফডিআর এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার হয়েছেন তিনি। গোপন লকারে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ মজুদসহ স্ত্রী ও স্বজনদের নামে গড়ে তুলেছেন অঢেল সম্পদ।

​আহম্মদুল্লাহর প্রভাব এতটাই প্রকট যে, তিনি বিপিসিতে নিজের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে ‘বরিশাল সিন্ডিকেট’ গড়ে তুলেছেন। জ্বালানি খাতের অন্তত ১০ জন কর্মকর্তাকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করেছেন, যারা সবাই তার নিজ অঞ্চলের। তার এই সিন্ডিকেটের অন্যতম সহযোগী হলেন উপ-ব্যবস্থাপক মো. আশিক শাহরিয়ার, যিনি অঘোষিত ক্যাশিয়ার হিসেবে বিভিন্ন ডিপো ও রিফাইনারি থেকে অর্থ সংগ্রহ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যোগ্যতার অভাবে এসিএআর-এ কম নম্বর পেলেও আহম্মদুল্লাহর প্রভাবে মাত্র ৩ বছর ১৭ দিনে আশিক পদোন্নতি পান। এছাড়া বিপিসির ঢাকা রেস্ট হাউস ও লিয়াজো অফিসসহ অধীনস্থ কোম্পানিগুলোতে নিজের আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের নিয়োগ দিয়ে পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রেখেছেন। তার বিরাগভাজন হওয়ায় অনেক দক্ষ কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত বা বদলি হতে হয়েছে, যার অন্যতম উদাহরণ ঢাকা রেস্ট হাউসের সাবেক ইনচার্জ মোহাম্মদ শফিউল ইসলাম।

​বিপিসির বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও ব্যাংক লেনদেন থেকেও বিপুল পরিমাণ কমিশন হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে আহম্মদুল্লাহর বিরুদ্ধে। এসপিএম প্রকল্প, ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইন ও ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন প্রকল্প থেকে শ্রমিক নিয়োগ ও কেনাকাটার নামে তিনি লক্ষ লক্ষ টাকা পকেটে পুরেছেন। বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠ এস আলম গ্রুপের সঙ্গে বিশেষ সখ্যতা গড়ে তুলে তাদের ব্যাংকগুলোতে বিপিসির হাজার হাজার কোটি টাকা জমা রাখেন তিনি, যার বিনিময়ে নিজের আত্মীয়দের ওই সব ব্যাংকে চাকরি পাইয়ে দেন। বর্তমানে এস আলম গ্রুপের ব্যাংকগুলোতে আটকে থাকা বিপিসির প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকা উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া বেসরকারি রিফাইনারি থেকে মাসিক মাসোয়ারা গ্রহণ, বিটুমিন ও ক্রুড অয়েল আমদানির অনুমোদন পাইয়ে দিতে শিল্পগোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ গ্রহণ এবং ইস্টার্ণ রিফাইনারির যন্ত্রাংশ ক্রয়ের নামে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের।

​সাম্প্রতিক সময়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আপ্যায়ন ও জ্বালানি বিল বাবদ ৫ লাখ ৫৯ হাজার ৯৫১ টাকা উত্তোলন এবং সাবেক চেয়ারম্যানকে খুশি করার নামে এসি কেনার জন্য এক চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা গ্রহণের সুনির্দিষ্ট ব্যাংক প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিপিসির সকল নিয়োগ বাণিজ্যের মূল হোতা হিসেবে তাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। বার্তাবাহক পদে ভুয়া ঠিকানায় নিয়োগ দিয়ে জালিয়াতি করার বিষয়টি তদন্তে প্রমাণিত হলেও তিনি বহাল তবিয়তে রয়েছেন। বর্তমানে দুদক তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করলেও আহম্মদুল্লাহ তার প্রভাব ব্যবহার করে তা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে।

তার বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান চলমান আছে বলে জানা গেছে। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি তিনি দুদকের প্রধান কার্যালয়ে তার সম্পদের হিসাব বিবরণী জমা দিয়েছেন।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি গণমাধ্যমকে বিপিসি চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব আহম্মদুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে একই পদে বহাল আছেন এবং নিজ জেলা ঝালকাঠি বলে স্বীকার করেন। তিনি বলেন, এছাড়া অন্য যেসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে সবই বানোয়াট-ভূয়া।

- Advertisement -spot_img
  • পঠিত
  • সর্বশেষ

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত