বাংলাদেশে যে হাম একসময় নিয়ন্ত্রণে ছিল, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ থেকে হাম-রুবেলা নির্মূলে চলছিল বিশেষ ক্যাম্পেইন। আজ ২০২৬ সালে এসে হঠাৎ করে সেই রোগে একের পর এক শিশু মৃত্যুর ঘটনা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে৷ সেই সাথে সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল দেয়া, “গত আট বছর অতি সংক্রামক এ রোগটির টিকা না দেওয়ার কারণেই এখন হামের প্রকোপ আবার দেখা যাচ্ছে” সংক্রান্ত বক্তব্য জন্ম দিয়েছে নতুন বিতর্ক ।
যদিও পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা৷ দেশে টানা কয়েক বছর সন্তোষজনক অগ্রগতির পর দেশে হামের টিকাদান কভারেজে বড় ধরনের পতন দেখা দিয়েছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) বয়সভিত্তিক উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এমআর-১ (মিজেলস-রুবেলা/হাম-রুবেলা) ও এমআর-২ টিকার কভারেজ ৮০ শতাংশের ওপরে থাকলেও ২০২৫ সালে তা নেমে আসে ৬০ শতাংশের নিচে৷
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে এমআর-১ টিকার কভারেজ ছিল ৮৭ দশমিক ৪ শতাংশ এবং এমআর-২ ছিল ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৮৬ দশমিক ৪ ও ৮৪ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০১৯ সালে ৮৮ দশমিক ১ ও ৮৬ দশমিক ১ শতাংশ, ২০২০ সালে ৮১ দশমিক ৭ ও ৮০ দশমিক ৫ শতাংশ কভারেজ ছিল। ২০২১ সালে এই হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে দাঁড়ায় ৯৭ দশমিক ৩ ও ৯৪ দশমিক ৮ শতাংশে। ২০২২ সালে এমআর-১ শতভাগ এবং এমআর-২ ৯৭ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছে। ২০২৩ ও ২৪ সালেও এই হার ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশের মধ্যে ছিল। তবে ২০২৫ সালে এসে সেই চিত্র পাল্টে যায়। ওই বছর এমআর-১ টিকার কভারেজ নেমে আসে ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশে এবং এমআর-২ টিকার কভারেজ ৫৭ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়ায়, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন।

চলতি বছরে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। একাধিক বিভাগের কমপক্ষে সাত জেলায় রোগটি বড় আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যে এই রোগে শতাধিক শিশুর মৃত্যু ঘটেছে। শুধু চলতি মাসেই হামে ২১ জন শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। হাসাপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে শত শত শিশু।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হামের ব্যাপারে যথাযথ মনোযোগ না দেওয়ায় পরিস্থিতি এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। শিশুদের হামের টিকা দেওয়ায় ঘাটতি আছে। হাম খুবই সংক্রামক, অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একজন আক্রান্ত হলে তার থেকে ১৫–১৮ জন সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এই রোগ আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে, শিশুমৃত্যু বাড়তে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. আবু হোসেইন মো. মইনুল আহসান গণমাধ্যমকে বলেছেন, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হামে আক্রান্ত হওয়ার খবর আসছে। কিছু এলাকায় বেশি হলেও সার্বিকভাবে সংক্রমণ বাড়তির দিকেই। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বড় ১০টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড খোলা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী আইসিইউ সুবিধাও বাড়ানো হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, দেশে হামের এই আকষ্মিক প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় নতুন করে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ জানিয়েছেন, আগামী জুলাই-আগস্টে দেশজুড়ে এই ক্যাম্পেইন চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি জানান, টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করতে বৈশ্বিক জোট গ্যাভিকে অবহিত করা হয়েছে। আগামী মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে প্রায় ২ কোটি সিরিঞ্জ পাওয়ার কথা রয়েছে। প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেই কর্মসূচি শুরু করা হবে।
অন্যদিকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসা জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি ডিএনসিসি হাসপাতালে হামের জন্য আলাদা ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে এবং আইসিইউ সুবিধাও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।


