চট্টগ্রামে সীতাকুন্ড উপকূলে কেআর শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডের দুই শ্রমিকের মৃত্যু নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে৷ গতকাল সোমবার (৫ ডিসেম্বর) সকালে কুমিরা উপকূলীয় এলাকা থেকে গাইবান্ধা জেলার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম (৩৮) ও আবদুল খালেক (৩৪) নামের দুই শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয় । তবে নিহতদের মধ্যে একজনের মরদেহ খণ্ডবিখণ্ড অবস্থায় পাওয়ায় প্রকৃত ঘটনা নিয়ে নানান প্রশ্ন ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে।
সূত্রে জানা যায়, সোমবার সকাল ৮টায় কুমিরা স্টেশনের একটি উদ্ধারকারী দল উপকূলীয় সাগর এলাকা থেকে মরদেহ দুটি উদ্ধার করে। এ ঘটনায় আশরাফুল ইসলাম ও রুবেল হাসান নামের আরও দুই শ্রমিক সাগরে পড়ে গেলেও পরে জীবিত উদ্ধার হন। তারা স্থানীয় কেআর শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে ওয়্যার শ্রমিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
ঘটনার পর পর কেআর শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবু সাজ্জাদ মুন্না ঘটনার বিষয়ে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, গভীর রাতে ডাকাতরা কারখানায় চুরির উদ্দেশ্যে আসে। বিষয়টি টের পেয়ে চার জন নিরাপত্তাকর্মী একটি বোট নিয়ে তাদের ধাওয়া করলে ডাকাতদের হাতে থাকা অস্ত্র দেখে আতঙ্কিত হয়ে দুই শ্রমিক সাগরে ঝাঁপ দেন। এরপর ডাকাতরা বাকি দুই নিরাপত্তাকর্মীকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে।
তবে উদ্ধারকৃর দুই শ্রমিকের মধ্যে সাইফুল ইসলামের মরদেহ মারাত্মকভাবে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায় যা ধারালো অস্ত্রের আঘাত নয় বলে অনেকেই সন্দেহ করেন । অভিযোগ উঠে ঘন কুয়াশার মধ্যে কারখানায় নতুন একটি জাহাজ বিচিংয়ের (ভেড়ানোর) সময় ভুল ক্রমে সেটি শ্রমিক বোঝাই বোটকে আঘাত করলে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে৷ বিশেষ করে জাহাজের প্রোপেলারের আঘাতে নিহত এক শ্রমিকের দেহ ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়৷ একই সাথে শ্রমিকদের বহনকারী লাল রঙের বোটটিও ভেঙ্গে চুরমার হয় তার অংশবিশেষ ইয়ার্ডের উপকূলে পাওয়া যায়৷

আর এসব অভিযোগ আরো জোরালো হয় যখন সেই রাতে বেঁচে ফেরা শ্রমিক লিটন সরকার জানান, আমরা কোনো ডাকাতই দেখিনি৷ তিনি গণমাধ্যমকে জানান, আমরা চারজন ওয়্যারের বোটে ছিলাম৷ এসময় বোটটি স্থির অবস্থায় ভিড়তে থাকা জাহাজের অপেক্ষামান ছিল৷ মূলত ইয়ার্ডে ভিড়তে থাকা জাহাজের নোঙ্গর কে বিশেষ ধরনের স্ক্রেনের সাথে যুক্ত করার কাজটি তারা করার কথা৷ এসময় বোটে কোনো মাঝি ছিল না৷ মাঝি অন্য আরেকটি খালি বোটে অবস্থান করছিলেন৷ হঠাৎ এক ধাক্কায় আমি বোট থেকে ছিটকে যাই৷ জাহাজের প্রোপেলার আমার তুলি অন্যত্র ছুড়ে ফেলে দেয়৷ এসময় তাদের বহনকারী বোটটি প্রোপেলারের ধাক্কায় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়৷ লিটন সরকার আরো বলেন, “আমি বোটের ভাঙ্গা অংশ ধরে ভেঙ্গে ছিলাম আমার আরেক সহকর্মী একটি কর্কসিট ধরে ভেসে ছিল৷ আমরা আমাদের মাঝিকে অনেক করে ডাকলেও তিনি আমাদের উদ্ধারে তাৎক্ষনিক ছুটে যায়নি। পরে অন্যান্যরা এসে বলার পর তাদের উদ্ধার করা হয়৷ লিটন সরকার দাবী করেন, জাহাজের প্রোপেলারটি অন্তত দুই ঘন্টা যাবৎ ঘুর্ণমান অবস্থায় ছিল। ডাকাতের প্রসঙ্গে তিনি বলেন,” মিথ্যা কথা বলে লাভ নেই যেটা সত্য সেটি হলো আমরা কোনো ডাকাত দেখিনি৷”

কেআর শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডের হেড অব ফাইন্যান্স আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ শাদ এখনই সময়কে বলেন, এটি একটি ডাকাতিরই ঘটনা৷ মাস খানের আগেও আমাদের ইয়ার্ডে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছিল৷ বাহিরে বোট দেখে আমাদের সিকিউরিটিরা ওদের প্রতিহত করতে গিয়েছিল৷ জীবিত উদ্ধার হওয়া শ্রমিকের ভিন্ন ভাষ্যের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আসলে ডাকাতদের হাতে অস্ত্র দেখে ওরা ফিরে আসার সময় ওদের বোটটা কিভাবে উন্টে গেছে সেটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না৷ তবে আমাদের রেসকিউ বোটটি যে উল্টে গেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই৷ এখন কে কিভাবে বিষয়টা ব্যাখ্যা করছে সেটি আমি বলতে পারবো না৷ একটি গ্রীণ শিপ ইয়ার্ডের স্বীকৃতি প্রাপ্ত ইয়ার্ডে এমন দুর্ঘটনা ইয়ার্ডের সার্বিক নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটি আমার ইয়ার্ডের কোন ঘটনা নয়৷ ঘটনাটি আমাদের ইয়ার্ড থেকে ১২ থেকে ১৩ ফিট দূরে ঘটেছে। আমাদের ইয়ার্ড শতভাগ কমপ্লাইন্স মেনটেইন করে। এখানে সেফটি, সিকিউরিটি নিয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।” ঘটনাস্থল ১২ শত গজ দূরে হলেও বিষয়টি ইয়ার্ড সংশ্লিষ্ট কিনা প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, যেহেতু আমাদের শ্রমিক হতাহত হয়েছে সেক্ষেত্রে ঘটনাটি আমাদের ইয়ার্ড সংশ্লিষ্ট হলেও ইয়ার্ডের অপারেশনের সাথে এই ঘটনার কোন সংশ্লিষ্টতা নেই৷ প্রোপেলারের ধাক্কায় বোট ভেঙ্গে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যে বোটের ভাঙ্গা অংশ দেখা গেছে বলা হচ্ছে সেটি আমাদের বোটের অংশ নাও হতে পারে৷ কিংবা পুরাতন অন্য কোন বোটের অংশ হতে পারে৷
নিহতের ক্ষতিপূরণের বিষয়ে কেআর শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডের হেড অব ফাইন্যান্স আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ শাদ এখনই সময়কে বলেন, “নিহতের পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হচ্ছে৷ শ্রম আইন অনুযায়ী ও আমাদের প্রতিষ্ঠানের পলিসি মোতাবেক নিহতদের যা যা প্রাপ্য তা শতভাগ প্রদান করা হবে এই বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কোন প্রকার গড়িমসি করবে না।
অন্যদিকে, জাহাজভাঙা শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন ও স্থানীয় বাসিন্দারাও দাবি করছে এটি কোন ডাকাতির ঘটনা নয়, বরং দুর্ঘটনা। রাতে কারখানায় নতুন একটি জাহাজ বিচিংয়ের সময় জাহাজের ধাক্কায় শ্রমিকদের ব্যবহৃত নৌকাটি ভেঙে যায়। এতে নৌকায় থাকা শ্রমিকরা সাগরে পড়ে গেলে দুজনের মৃত্যু হয় এবং একজনের মরদেহ খণ্ডবিখণ্ড হয়ে পড়ে।
শিল্প পুলিশের পরিদর্শক হাসান মাহমুদ বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে।


